ঢাকা: জীবন বাঁচাতে নিজের অবশিষ্ট পা নিজেই কেটে ফেলেছিলেন ইউক্রেনের এক সেনা। প্রায় আট মাস বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের বয়লারঘরের নিচে গর্তে আশ্রয় নিয়ে থাকার পর অবশেষে ড্রোনের সাহায্যে তাঁকে উদ্ধার করা হয়েছে। গত ৪ অক্টোবরের এই উদ্ধার অভিযানকে কোনো সেনাকে আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে উদ্ধারের প্রথম জানা ঘটনা বলে দাবি করেছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী।
উদ্ধার হওয়া ওই সেনার নাম কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। ৪৯ বছর বয়সী এই পদাতিক সেনা ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য। তিনি খারকিভ অঞ্চলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্মুখসারিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার একটি ড্রোন হামলায় ভ্লাসেনকোর বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই হামলায় তাঁর ডান পা-ও ভেঙে যায় এবং বেঁকে যায়। এতে তাঁর পক্ষে হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠলে প্রায় তিন মাস পর বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজের ডান পা-টিও ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেন তিনি। এরপর রক্তপাত বন্ধ করতে পায়ে টুর্নিকেট বাঁধেন। এভাবেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
আট মাস গর্তে বন্দি
ভ্লাসেনকো প্রায় আট মাস বোমায় বিধ্বস্ত স্কুলটির বয়লারঘরের নিচে একটি গর্তে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে তাঁর মোট অবস্থানের সময় ছিল ৪৯১ দিন।
সেখানে তাঁর সঙ্গে এক সহযোদ্ধাও ছিলেন, যার ছদ্মনাম ছিল ‘বাস্কি’। তাঁরা একটি ছোট বাঙ্কারে থাকতেন এবং ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিদিন খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পেতেন। সরবরাহের মধ্যে চকলেট ও উন্নত মানের সিগারেটও থাকত।
গত বছরের শরৎকালে তাঁদের অবস্থানে সেনা বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ভ্লাসেনকোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে প্রতিস্থাপন করতে পাঠানো দুই সেনাই সেখানে যাওয়ার পথে নিহত হন। পরে তাঁদের মরদেহ উদ্ধারে পাঠানো আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান।
এরপর ভ্লাসেনকোর মনে হয়, ওই অবস্থান থেকে আর কারও জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।
ছয় প্রপেলারের ড্রোনে উদ্ধার
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ৪ অক্টোবর ভ্লাসেনকোকে উদ্ধারে বিশেষ ড্রোন অভিযান চালানো হয়। ছয়টি প্রপেলারযুক্ত একটি বড় ড্রোনের সঙ্গে তাঁকে বিশেষ হারনেস দিয়ে বেঁধে আকাশে তুলে নেওয়া হয়। দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত ড্রোনটি তাঁকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার বা ৯ মাইল দূরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
ইউক্রেনীয় সামরিক কমান্ডারদের দাবি, কোনো সেনাকে ড্রোনের সাহায্যে এভাবে আকাশপথে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার কীভাবে যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে, এই অভিযান তারও একটি নজির।
‘আমি জানতাম, আর কোনো আশা নেই’
উদ্ধারের পর খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান ভ্লাসেনকো। তাঁর দুই পায়ের কাটা অংশে তখন ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল।
তিনি বলেন, “আমি তো আগেই নিজেকে মৃত ভেবে কবর দিয়ে দিয়েছিলাম। আমি জানতাম, আর কোনো আশাই অবশিষ্ট নেই।”
রয়টার্স জানিয়েছে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর বক্তব্য এবং উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ ভ্লাসেনকোর কাহিনিকে সমর্থন করে। তবে তাঁর বর্ণনার সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ড্রোনের কারণে বিপজ্জনক সম্মুখসারি
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারির অনেক এলাকাকে এখন ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুঅঞ্চল বলা হয়। আকাশে বিপুলসংখ্যক ড্রোনের উপস্থিতির কারণে সেনাদের সামান্য চলাচলও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ফলে দুই পক্ষের সেনারাই মাটির গভীরে গর্ত ও পরিখায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের মাসের পর মাস একই অবস্থানে আটকে থাকতে হচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের আধিপত্য রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রাও অনেকাংশে বাধাগ্রস্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুই পক্ষেই হতাহতের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
ভ্লাসেনকোর ক্ষেত্রে যে প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়েছে, সেই ড্রোনই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন বাঁচিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
পিএস