কফি পানের পর শরীরে কী ঘটে, গবেষণায় মিলল নতুন তথ্য

  • লাইফস্টাইল ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬, ০৯:১৮ এএম

সকালের অলসতা কাটাতে বা কাজের মাঝে মনোযোগ ফেরাতে এক কাপ গরম কফির জুড়ি নেই। তবে কফি আমাদের শরীরে ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের শেষ নেই।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কফির প্রভাব কেবল সাময়িকভাবে ঘুম তাড়ানো বা মস্তিষ্কে উদ্দীপনা জোগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আমাদের পেটের (অন্ত্রের) কোটি কোটি অণুজীবের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জানেন, মানুষের অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে সারাক্ষণ তথ্য আদান-প্রদান হয়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় অন্ত্র-মস্তিষ্ক অক্ষ।

এই যোগাযোগে ভূমিকা রাখে স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অন্ত্রে বসবাসকারী কোটি কোটি উপকারী অণুজীব।

এসব অণুজীব খাবার ভেঙে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি করে, যা প্রদাহ, মানসিক চাপ, আবেগ এবং চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, কোনও একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াই মানুষের সুখ বা দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করে। বরং খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, ওষুধ, মানসিক চাপ ও জিনগত বৈশিষ্ট্য—সবকিছু মিলেই এই জটিল ব্যবস্থা কাজ করে।

কেন কফি নিয়ে আগ্রহ?

কফিতে শুধু ক্যাফেইন নয়, শত শত জৈব-সক্রিয় উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে পলিফেনলসহ কিছু যৌগ বৃহদান্ত্রে পৌঁছে উপকারী অণুজীবের খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে অন্ত্রের অণুজীবের গঠন ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে। গবেষকদের ধারণা, এই পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কেও পৌঁছাতে পারে।

কীভাবে হয়েছে গবেষণা?

আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের গবেষকেরা ৬২ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে গবেষণা করেন। তাদের মধ্যে ৩১ জন নিয়মিত কফি পান করতেন এবং বাকি ৩১ জন কফি পান করতেন না।

ভাইবোন কেন ঝগড়া করে? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
অংশগ্রহণকারীদের মেজাজ, মানসিক চাপ, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও অন্যান্য জ্ঞানীয় সক্ষমতা মূল্যায়নের পাশাপাশি তাদের মল ও প্রস্রাবের নমুনা বিশ্লেষণ করে অন্ত্রের অণুজীব ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।

নিয়মিত কফি পানকারীদের প্রথমে দুই সপ্তাহ কফি পান বন্ধ রাখতে বলা হয়। এরপর তাদের একদলকে ক্যাফেইনযুক্ত এবং অন্য দলকে ক্যাফেইনমুক্ত কফি তিন সপ্তাহ পান করানো হয়।

গবেষণায় কী পাওয়া গেল?

গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত কফি পানকারীদের অন্ত্রের অণুজীবের গঠন অন্যদের তুলনায় ভিন্ন ছিল। কফি পান বন্ধ করার পর কিছু পরিবর্তন আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। পরে আবার কফি পান শুরু করলে অন্ত্রের অণুজীবে নতুন পরিবর্তন দেখা যায়।

গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই পরিবর্তনের কিছু অংশ ক্যাফেইনযুক্ত ও ক্যাফেইনমুক্ত—দুই ধরনের কফি পান করার পরই দেখা গেছে। অর্থাৎ, শুধু ক্যাফেইন নয়; কফির অন্যান্য উপাদানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্যাফেইনযুক্ত ও ক্যাফেইনমুক্ত কফির পার্থক্য

গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্যাফেইনযুক্ত কফি মনোযোগ ও সতর্কতা বাড়াতে তুলনামূলক বেশি কার্যকর ছিল। একইসঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উদ্বেগও কিছুটা কম দেখা গেছে। অপরদিকে, ক্যাফেইনমুক্ত কফি শেখা ও স্মৃতিশক্তির কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।

এ ছাড়া দুই দলই মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার উপসর্গ কিছুটা কম অনুভব করেছেন বলে জানিয়েছেন।

তবে সব ফল ইতিবাচক নয়

গবেষণাটি কফিকে কোনো ‘অলৌকিক পানীয়’ হিসেবে তুলে ধরেনি। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের মধ্যে আবেগগত প্রতিক্রিয়া ও হঠকারিতার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি ছিল। অপরদিকে, যারা কফি পান করতেন না, তাদের কিছু স্মৃতিনির্ভর পরীক্ষার ফল ভালো ছিল।

গবেষকদের মতে, এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। স্বভাবগতভাবে বেশি ক্লান্ত, উদ্দীপনাপ্রিয় বা আবেগপ্রবণ ব্যক্তিরা হয়তো তুলনামূলক বেশি কফি পান করেন। আবার দীর্ঘদিন কফি পান করলে শরীরে ক্যাফেইনের সহনশীলতা তৈরি হওয়া বা কফি না খাওয়ার প্রভাবও ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাহলে কি কফি মানসিক সমস্যার সমাধান?

সংক্ষিপ্ত উত্তর—না। গবেষকেরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই গবেষণার ভিত্তিতে বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা স্মৃতিশক্তির সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে কফি পান শুরু করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

অতিরিক্ত ক্যাফেইন অনেকের ক্ষেত্রে উদ্বেগ, অনিদ্রা, বুক ধড়ফড় বা হজমের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি মানসিক অস্থিরতাও বাড়াতে পারে।

গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কফির প্রভাব শুধু ঘুম তাড়ানো বা সাময়িকভাবে চাঙা করে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্ত্রের অণুজীব, শরীরের বিপাকক্রিয়া এবং মস্তিষ্ক—এই তিনের জটিল সম্পর্কেও কফি ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিষয়টি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। তাই কফিকে কোনও ওষুধ নয়, বরং এমন একটি জটিল খাদ্য উপাদান হিসেবে দেখা উচিত, যার প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে।