দল ও সরকারে ভারসাম্য

পদ হারাতে পারেন বিএনপির যেসব এমপি-মন্ত্রীরা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
ফাইল ছবি

দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার পালাবদলের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা সরকার ও বিএনপির সম্পর্ক এখন অনেকটাই সমান্তরাল অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা দলের শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ একই সঙ্গে দলীয় রাজনীতিতেও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। এতে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে দলটির নীতিনির্ধারক মহল। এমন বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় পদ ছাড়া জেলা, মহানগর ও থানা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিএনপি।

দলীয় সূত্র বলছে, নতুন নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও গতিশীল করতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সরকারের দায়িত্বে থাকা অনেক মন্ত্রী ও এমপিকে তৃণমূলের দলীয় পদ ছাড়তে হতে পারে। একই সঙ্গে বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এক নেতার এক পদ নীতি এবার কঠোরভাবে কার্যকর হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দেশের রাজনীতিকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল যারা মন্ত্রী বা এমপি থাকবেন, তারা দলের মাঠপর্যায়ের শীর্ষ পদে থাকবেন না। এই মডেল অনুসরণ করেই মূলত এক নেতা এক পদ নীতি চালু করেছিল বিএনপি, যা ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে গঠনতন্ত্রেও যুক্ত করা হয়।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু এই বিষয়ে জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে দল ও সরকারের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রাখা হতো। তৎকালীন সময়ে কোনো নেতা সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হলে অন্যদের নেতৃত্বের সুযোগ করে দিতে জেলা বা মহানগরের পদ থেকে পদত্যাগ করতেন। বর্তমান তিন মাস বয়সী সরকারের নতুন সাংগঠনিক কাজ সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে এগোবে এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার বাবার দেখানো পথ অনুসরণ করেই দল ও সরকার পরিচালনা করবেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল—এই তিন সংগঠনের অন্তত ছয়জন প্রভাবশালী নেতা ইতোমধ্যে এমপি ও মন্ত্রী হয়েছেন। এদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান রয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা-১৮ আসনের এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন, ফেনী-১ আসনের রফিকুল আলম মজনু, ভোলা-৪ আসনের নূরুল ইসলাম নয়ন এবং গোপালগঞ্জ-৩ আসনের এসএম জিলানীও এই তালিকায় আছেন। এদের সরিয়ে দিয়ে এই তিন ইউনিটে নতুন কমিটি গঠনের কাজ পুরোদমে চলছে।

সংসদ সদস্যের পাশাপাশি জেলা ও মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে থাকা আরও অনেক হেভিওয়েট নেতা এই সিদ্ধান্তের আওতায় আসছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:- লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, লালমনিরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু, পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, কক্সবাজার-৪ আসনের শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৮ আসনের এরশাদ উল্যাহ এবং নরসিংদী-১ আসনের খায়রুল কবির খোকন।

এ ছাড়া বান্দরবানের সাচিং প্রু, সিলেটের এমরান আহমদ চৌধুরী, নরসিংদীর মনজুর এলাহী, জামালপুরের ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীম ও শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন, চাঁদপুরের শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলসহ বেশ কিছু সংসদ সদস্যকে জেলা বা মহানগরের পদ ছাড়তে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ণ করা এবং প্রশাসনে গতি আনার জন্য এটি বিএনপির একটি অত্যন্ত কৌশলী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। একই নেতার হাতে দল ও সরকারের দ্বৈত দায়িত্ব থাকলে মাঠপর্যায়ে স্থবিরতা তৈরি হতে পারে। জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক মডেলকে পুনরুজ্জীবিত করে তারেক রহমানের এই সাহসী পদক্ষেপ বিএনপিতে নতুন ও তরুণ নেতৃত্ব তৈরির পথকে যেমন সুগম করবে, তেমনি সরকারি কর্মকাণ্ডেও পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

এসএইচ