নতুন সরকারের প্রথম প্রস্তাবিত বাজেট অধিবেশন শুরু

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

ঠিক দুই দশক আগের কথা। ২০০৬ সালের জুনে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ বাজেট পেশ করেছিলেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। কুড়ি বছরের দীর্ঘ বিরতি এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজ ফের জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি আর বিনিয়োগ মন্দার এই কঠিন সময়ে আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১১২ দিনের মাথায় এটিই হতে যাচ্ছে বর্তমান প্রশাসনের প্রথম এবং দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট। কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন এই সংসদের বাজেট অধিবেশন আগামী ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে এবং প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর মোট ৪০ ঘণ্টা সাধারণ আলোচনা হবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সংসদ ছাড়াই উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরের বাজেট দিলেও, এবারই প্রথম নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার হিসেবে বাজেট নিয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিএনপি।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন ঘটাতে এবার রেকর্ড পরিমাণ খরচের পথে হাঁটছে সরকার। এবারের বাজেটের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো—সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। বিগত প্রায় ১১ বছর যাবত সরকারি কর্মচারীরা একই স্কেলে বেতন পাওয়ায় চড়া মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তা দূর করতে নতুন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মূল বেতনের ৫০ শতাংশ আগামী ১ জুলাই থেকেই কার্যকর করা হচ্ছে। নতুন পে-স্কেলের এই প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে বাজেটে আলাদাভাবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যার কারণে সামগ্রিক জনপ্রশাসন খাতের ব্যয় চলতি অর্থবছরের তুলনায় এক ধাক্কায় ৯৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হচ্ছে।

বাজেটের আরেকটি বিশাল সুখবর থাকছে দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও পরিধি সম্প্রসারণে এ খাতের মোট বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরে ছিল মাত্র ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। এর বাইরে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য আরও ৭ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকার পৃথক বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা, কৃষি ও তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বড় চমক থাকছে অর্থমন্ত্রীর ঝোলায়।

রাজস্ব ও শুল্ক কাঠামোতে সাধারণ মানুষের স্বস্তি এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য যুগান্তকারী কিছু সিদ্ধান্তের আভাস পাওয়া গেছে। নতুন বাজেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার ঘোষণা আসছে। এমনকি বিদেশ থেকে আসা এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের আয়কে 'প্রবাসী আয়' বা রেমিট্যান্সের স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে, যার ফলে তাঁরা প্রবাসী আয়ের মতো নগদ প্রণোদনাও পাবেন। এ ছাড়া স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কর অব্যাহতি সুবিধাও বহাল থাকছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসাহিত করতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সালের জুন পর্যন্ত অর্জিত আয়ের ওপর সম্পূর্ণ করছাড় দেওয়া হচ্ছে।

সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে পৌনে ৪ লাখ (৩ লাখ ৭৫ হাজার) টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমার একটি দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখাও ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী। সাধারণ করদাতার পাশাপাশি নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং 'জুলাই যোদ্ধা' অর্থাৎ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। করদাতারা এখন থেকে বছরজুড়েই রিটার্ন জমা দিতে পারবেন, তবে বছরের শুরুতে দিলে মিলবে বিশেষ করছাড়। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের টার্নওভার করের করমুক্ত সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হচ্ছে।

আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট পুনর্বিন্যাসের কারণে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় ও প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমতে যাচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, গম, পেঁয়াজ ও চিনিসহ ৬০টি মৌলিক ভোগ্যপণ্য ও কৃষিপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান উৎসে কর এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমতে পারে। এ ছাড়া ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে পিওএস (POS) মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। দেশে ফ্রিজ ও এসি উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করার কারণে এসি-ফ্রিজের দাম কমবে। মোবাইল উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানির অগ্রিম কর ৫ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনায় দেশীয় স্মার্টফোনের দামও কমতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির শুল্ক-কর ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে মূল্যভেদে ৬৪ ও ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব গাড়ির বাজার সস্তা করবে।

তবে শুল্ক ও করের নতুন মারপ্যাঁচে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। খুচরা পর্যায়ে করের আওতা বাড়াতে ডিস্ট্রিবিউশন বা সরবরাহ চেইনে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বসানো হচ্ছে, যার ফলে প্রতি হাজার টাকার পণ্য সরবরাহে ২ টাকা কর দিতে হবে খুচরা ব্যবসায়ীদের। স্থানীয় উৎপাদনকারীদের সুরক্ষায় আমদানি করা কাজুবাদামের শুল্ক ৫ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘরবাড়ি নির্মাণের প্রধান উপাদান এমএস রডের ওপর ভ্যাট প্রতি টনে ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা করার প্রস্তাব আসায় রডের দাম বাড়বে। প্রতি বছরের মতো এবারও তামাকবিরোধী জোট ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবিতে সিগারেট ও বিড়িসহ সব ধরনের তামাকপণ্যের মূল্যস্তর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে, যার ফলে ধূমপানের খরচ এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যাবে।

বিশাল ব্যয়ের এই বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরকেই তুলতে হবে রেকর্ড ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সত্ত্বেও সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার বরাবরের মতোই ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ঘাটতির সিংহভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই নেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে ঋণ হিসেবে, আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে সঞ্চয়পত্র থেকে।

শত কোটি টাকার ঘাটতি আর ব্যাংক ঋণের ওপর চড়া ভরসা সত্ত্বেও, কুড়ি বছর পর বিএনপির এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটটি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতের মাধ্যমে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির অভিমুখে যাত্রার প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসএইচ