ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন রুখতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
ফাইল ছবি

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও জনপ্রত্যাশিত গণতন্ত্রকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেশের সর্বস্তরের জনগণের। ফ্যাসিবাদের যেকোনো ধরনের প্রত্যাবর্তন এবং ষড়যন্ত্র রুখতে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় ও অটুট রাখার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত “গণঅভ্যুত্থানের বাঁক বদলের দিন” শীর্ষক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

মন্ত্রী তার বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবের প্রথমদিকের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘১৫ জুলাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তুমি কে আমি কে? রাজাকার রাজাকার’ এবং ‘কে বলেছে কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ স্লোগানে ইতিহাসের গতিপথ বদলে যাচ্ছিল, তখন আমি নির্বাসনে থাকলেও আমার পূর্ণ মনোযোগ ও সহযোগিতা ছিল এই আন্দোলনের সাথে।’

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ, কিন্তু রক্ষা করা কঠিন। স্বৈরাচারী শক্তি যেন আর কখনো এ দেশের গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে না পারে, সেজন্য আমরা রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার করতে চাই। এই লক্ষ্যে আমাদের প্রণীত ৩১ দফার আলোকেই নির্বাচনি ইশতেহার সাজানো হয়েছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশের সকল রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ স্বাক্ষর করেছে। এই সনদ অনুযায়ী সংবিধান ও অন্যান্য আইন-কানুনের প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করা আমাদের অঙ্গীকার।’

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচারের ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, ‘গতকাল পার্লামেন্টেও আমি স্পষ্টভাবে বলেছি- শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই। এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুযায়ী তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠানো হয়েছে। দেশে ফিরিয়ে এনেই তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং আদালতের রায় কার্যকর করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশে পলাতক ফ্যাসিবাদী সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি করা হয়েছে এবং এরই প্রেক্ষিতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ বা বিচারের মুখোমুখি করার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কোনো প্রশাসনিক আদেশে বা এক্সিকিউটিভ অর্ডারে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই। আমরা চাই সম্পূর্ণ আইনানুগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার (Judicial Process) মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের দোসর এই সংগঠনের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারিত হোক। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) অ্যাক্ট এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে, যার ফলে ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে দল হিসেবেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে। তাছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সংগঠন হিসেবেও বিচারের স্পষ্ট বিধান রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যেভাবে হিটলারের নাৎসি বাহিনী ও গেস্টাপোকে নিষিদ্ধ ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে আসমান থেকে গুলি করে শিশু ও গৃহিণী হত্যার মতো যে নজিরবিহীন গণহত্যা চালানো হয়েছে, তার দায় আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না।’

সালাহউদ্দিন আহমদ দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘এত বড় ম্যাসাকার বা হত্যাকাণ্ডের পরেও আওয়ামী লীগ ও তার নেত্রীর মনে কোনো অনুশোচনা বা ক্ষমা প্রার্থনার বালাই নেই, উল্টো তারা জুলাইয়ের বীর যোদ্ধাদের ‘জঙ্গিবাদী’ আখ্যা দিয়ে পুনরায় রাজনীতিতে ফেরার ঘৃণ্য স্বপ্ন দেখছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস মানেই রক্ষীবাহিনী দিয়ে ৩০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা, ধর্ষণের সেঞ্চুরি, একদলীয় বাকশাল কায়েম এবং ছাত্র রাজনীতিকে কলঙ্কিত করার ইতিহাস।’

জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার বা ব্যবসা না করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই জুলাই বিপ্লবের কৃতিত্ব কারো একার নয়। এ দেশের সাধারণ মানুষ বুক পেতে দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, কৃতিত্ব কেবলই তাদের।’

তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারের পরিণতি কেমন হয় তা ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর শিক্ষা নেওয়ার জন্য গণভবনকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপান্তরিত করা হচ্ছে।’ মন্ত্রী '৭১ ও '২৪-এর শহীদদের স্বপ্নের একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণ প্রজন্মসহ সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন বিএনপি'র যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। স্বাগত বক্তব্য রাখেন- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির।

অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।

এসএইচ