পদ্মা সেতুর সম্ভাবনায় দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: বরিশাল অঞ্চলকে কেবল শস্যভান্ডার নয়, বরং দক্ষিণ বাংলাদেশের মূল অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি ‘ভিশন বরিশাল-২০৫০’ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
 
শুক্রবার (১১সেপ্টেম্বর) বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিডিজেএ) আয়োজিত ‘আগামীর বরিশাল: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এই সুপারিশ করা হয়। সেমিনারে অতিথিরা বরিশালের সার্বিক উন্নয়নে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

বিডিজেএ’র উপদেষ্টা ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

প্রবন্ধে জানানো হয়, দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ বরিশাল বিভাগ থেকে আসে এবং প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া প্রতি বছর দেশের ১৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ পর্যটক কুয়াকাটা, ভাসমান পেয়ারা বাজার ও সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। তবে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্পখাতের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি হলেও বরিশালে তা ২ শতাংশেরও কম। বিসিক শিল্পনগরী থাকা সত্ত্বেও মূলধনের সংকট ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগ আটকে আছে। 

এ বাধা দূর করতে ভোলার গ্যাসসম্পদসহ দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর তাগিদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উপকূলের ২ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার এবং সুপেয় পানির সংকট তৈরির তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠে শিল্প ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে সেমিনারে বিডিজেএ’র পক্ষ থেকে ১০ দফা কৌশলগত সুপারিশ পেশ করা হয়:

নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ, সুপেয় পানি ও ডেল্টা অভিযোজনে পৃথক ‘উপকূলীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ গঠন। ঢাকা-পদ্মা সেতু-বরিশাল-পটুয়াখালী-পায়রা রেল সংযোগ চালু এবং ভাঙ্গা-কুয়াকাটা সড়ক ৬ লেনে উন্নীত করা। এতে করে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টায় যাওয়া যাবে।
 
দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডোর: বছরে ৭৫,০০০ কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিক হাব ও প্রসেসিং অঞ্চল গড়ে তোলা। ধান, মাছ, পেয়ারা ও আমড়ার মূল্যসংযোজনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোল্ড চেইন ও প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করা। নদীভাঙন, প্লাবন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ। সাশ্রয়ী পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ ড্রেজিং ও ব্লু-ইকোনমি সম্প্রসারণ। বরিশাল, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, বরগুনা ও সুন্দরবনকে যুক্ত করে পর্যটন সার্কিট তৈরি, যা রাজস্ব আয় দ্বিগুণ করতে পারে। তরুণদের ঢাকামুখী প্রবণতা বন্ধে আইটি হাব, কারিগরি ও মেরিন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জলবায়ু গবেষণা কেন্দ্রে রূপান্তর। ভিশন-২০৫০ বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ সমন্বয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠন।

সেমিনারে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পদ্মা সেতু সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে, এখন শিল্প, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত করতে সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

বক্তারা বলেন, বাস্তবমুখী আঞ্চলিক পরিকল্পনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা জয় করেই বরিশাল অঞ্চল দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধির নতুন অনুঘটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, অপার সম্ভাবনা থাকার পরও বরিশাল অঞ্চল উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য,  শিল্প কারখানা স্থাপন না  হওয়ায় অনেক দিক থেকে আমরা পিছিয়ে আছি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তৈরির ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তি হচ্ছে পানি। পানির ওপর দাঁড়িয়ে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম। বরিশাল বিভাগজুড়ে বিপুল পরিমাণ পানি থাকার পরও আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। তাই আগামীদিনে উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা সম্মিলিতভাবে বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।

প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান বলেন, বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে যেমন আমাদের কাজ করতে হবে, তেমনি উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে গুরুত্ব দিতে হবে ভবিষ্যতে ভালো রাজনীতিবিদ,  দক্ষ ও ভালো নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। কারণ অন্যান্য জায়গার মতো রাজনীতিও নষ্ট হয়ে গেছিলো গত ১৭বছর। ভালো ছেলেরা রাজনীতি করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। রাজনীতিবিদদের সন্তানরা রাজনীতি করতে চাচ্ছে না। এদিকে নজর দিতে হবে। কারণ ভালো নেতৃত্ব তৈরি না হলে আমরা যখন রাজনীতি করবো না তখন শূন্যতা তৈরি হবে। 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান এমন আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সবাই উন্নয়নের কথা বললেও আমাদের সমন্বয় কিংবা ঐক্যের ঘাটতি রয়েছে৷ আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে হবে। সবার মধ্যে ঐক্য দরকার সবার আগে।

তিনি বলেন, রাস্তাঘাট, সেতুসহ যেসব দাবি উঠেছে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন কিছু না। কারণ প্রধানমন্ত্রী অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে জানালে কাজ করা সহজ হবে। একইসঙ্গে জরুরি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দাবি হিসেবে তুলে ধরতে হবে। 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা চিন্তা করে অতীতে বরিশালের উন্নয়নের কাজ থামিয়ে দেয়া হয়েছো৷ যা পুরো অঞ্চলকে পিছিয়ে দিয়েছে। তবে এখন এই অঞ্চলের মানুষ এখন ভাগ্যবান। এখন আমাদের স্বর্ণযুগ। তাই গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারলে সামগ্রিক উন্নয়ন করা সহজ হবে। কারণ এমন সুযোগ আবার কখন আসবে সেটা বলা যায় না। 

বরিশাল অঞ্চলের সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। ভাবতে হবে মাকদের কারণে আমাদেরই সন্তানরা বিপদগামী হচ্ছে। 

তিনি বলেন, সবাইকে নিজ নিজ এলাকাকে ক্লিন, গ্রীণ ও সেইফ রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিন্তু এই কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেন। সবাইকে এটা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমন্বয়ের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করতে হবে। 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, পটুয়াখালীতে এক্সপার্ট প্রেসেসিং জোন হচ্ছে। সেখানে অর্ধেকের মতো হয়ে গেছে। বাকি কাজ চলমান আছে। বিনিয়োগকারীরা যোগাযোগ করছেন।। এটি চালু হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অর্থনীতির গতিপথ বদলে যাবে৷ এজন্য ছয় লেনের রাস্তা জরুরি, পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। 

এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবুর রহমান সরোয়ার, ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য  মো. রফিকুল ইসলাম জামাল, পিরোজপুর-৩ আসনের রুহুল আমিন দুলাল,পটুয়াখালী -২ আসনের শফিকুল ইসলাম মাসুদ বক্তব্য রাখেন।

এছাড়াও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আকন কুদ্দুস, সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, 
বরিশাল মেট্রোপলিট চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ও বিডিজেএর উপদেষ্টা মো. নিজাম উদ্দিন,

শ্যামলীর ২৫০ শয্যার টিভি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম খসরু, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, বিডিজেএর উপদেষ্টা আবু জাফর সূর্য, পটুয়াখালী জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি বদরুল আলম নাবিল,  ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কে এম শরিয়াতুল্লাহ প্রমুখ।

বিডিজেএ'র সভাপতি মাহবুব সৈকতের সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সানবির রুপল। ও  নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সেমিনার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক কাজী জেবেল।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এম. এম. বাদশাহ, সহ-সভাপতি কে জেড সোহেল, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, অর্থ ও দফতর সম্পাদক ফাহিম মোনায়েম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইউসুফ বাচ্চু, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিন্টু।

আরও উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী সদস্য- বিডিজেএ'র সাবেক সভাপতি তারিকুল ইসলাম মাসুম, মিজান সবুজ, কাজী জেবেল, এটিএন নাজিয়া আফরিন প্রমুখ।

পিএস