নতুন ৩ মেট্রোরেলসহ ১৮টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আজ উঠছে একনেকে

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬, ০৬:১৩ এএম
ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আজ বসছে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা। সভায় তিনটি মেট্রোরেলসহ মোট ১৮টি বড় প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।

এর মধ্যে মেট্রো রেল লাইন-৫ সাউদার্নসহ ১৬টি প্রকল্প একনেক নোটিশের কার্যতালিকায় ছিল। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর ব্যয় ৬৫ হাজার ৫১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে গতকাল দিনের শেষ সময়ে একনেক সভার টেবিলে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দান প্রকল্পও তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ দুই মেট্রো রেলের প্রস্তাবিত ব্যয়ই দুই লাখ চার হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

ফলে তিন মেট্রো রেলসহ আজকের সভায় উপস্থাপিত প্রকল্পগুলোর মোট প্রস্তাবিত ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা।

আজ বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভাটি হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।

আজকের একনেকের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এমআরটি লাইন-৫) সাউদার্ন রুট।

গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রো রেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত।

মেট্রো রেল লাইন-৫ সাউদার্ন রুটের ১৩.১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ এবং ৪.১০ কিলোমিটার উড়ালপথ। গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে এই রুট।

এতে থাকবে ১৫টি স্টেশন। মেট্রো রেল চালু হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগবে প্রায় ২৮ মিনিট।
এদিকে একনেকের টেবিলে উঠছে জাইকার অর্থায়নে চলমান এমআরটি লাইন-১। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের সর্বশেষ পুনর্গঠিত ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর আগে আগস্টের শুরুতে ব্যয় এক লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সুপারিশের পর বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমিয়ে নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে।

একইভাবে একনেকের টেবিলে উঠছে জাইকার অর্থায়নে আরেকটি চলমান প্রকল্প এমআরটি লাইন-৫ নর্দান বা হেমায়েতপুর-ভাটারা প্রকল্প। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের সর্বশেষ প্রস্তাবিত ব্যয় ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আগস্টে এ প্রকল্পের ব্যয় ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দানের সম্মিলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে দুই লাখ চার হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

তিন মেট্রো রেলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের প্রকল্প এমআরটি লাইন-১। বিমানবন্দর-কমলাপুর রুটের পাশাপাশি এমআরটি লাইন-৫ নর্দান ও সাউদার্ন রুট মিলিয়ে রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে বিপুল ব্যয়ের এসব প্রকল্প নিয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, নির্মাণ ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

এদিকে একনেকের তালিকায় থাকা অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণ। প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনে ব্যয় বাড়ছে চার হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। রেল খাতের আরেকটি বড় প্রকল্প নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু করা। এতে ব্যয় হবে তিন হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্য খাতেও রয়েছে বড় দুটি প্রকল্প। যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডস ও ম্যালেরিয়া মোকাবেলায় নেওয়া প্রকল্পটির ব্যয় চার হাজার ৩৯ কোটি ছয় লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন তিন হাজার ১৬৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ৮৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য খাতের আরেক প্রকল্পে ব্যয় হবে ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সড়ক খাতের দুটি প্রকল্পের মধ্যে রাজশাহী সড়ক জোনের জেলা মহাসড়ক উন্নয়নে ব্যয় হবে ৯৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতায় জেলা মহাসড়ক উন্নয়নের তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে ব্যয় হবে এক হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পও রয়েছে তালিকায়। বরিশাল সেনানিবাস স্থাপনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে ব্যয় হবে এক হাজার ১৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসনসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে ৩৭৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। দুটি প্রকল্পেই সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে।

আর্থিক খাতের ‘ফিন্যানশিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’-এ ব্যয় হবে এক হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মধ্যে ছোট ফেনী ও বামনী নদী অববাহিকায় সমন্বিত বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়নে ব্যয় হবে ৭৫১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রক্ষায় ব্যয় হবে ৬০৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এ ছাড়া খুলনা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, মনপুরা দ্বীপাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত তিনটি সংশোধিত প্রকল্পও একনেকে উঠছে। তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়নে নতুন একটি প্রকল্পে ব্যয় হবে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

আজকের সভায় ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরো ১৫টি প্রকল্পের বিষয়েও অবহিত করা হবে। এর মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়করণ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর নির্মাণ, ভাসানচরে সবুজ বেষ্টনী, কক্সবাজারে বন পুনঃস্থাপন, দেশি মুরগি গবেষণা ও সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন এবং সিলেট ১০ নম্বর অনুসন্ধান কূপ খননের মতো প্রকল্প রয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এর আগে সবচেয়ে বড় একনেক সভা হয়েছিল গত ১৩ মে। ওই সভায় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের ৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পও ছিল।

আজকের সভায় প্রস্তাবিত ১৬টি প্রকল্পের ৬৫ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা অনুমোদন পেলে শুধু এই অংশের আকারই মে মাসের একনেকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হবে। এর সঙ্গে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দানের মতো বিপুল ব্যয়ের প্রকল্প যুক্ত হওয়ায় আজকের একনেকের আকার অতীতের সব সভা ছাড়িয়ে যাবে।

এম