রান্নাঘরের চুলা থেকে শুরু করে যানবাহনের চাকা-সর্বত্রই যেন জ্বালানি সংকটের কালো ছায়া। খুচরা পর্যায়ে বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একই সঙ্গে যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও লিটারে প্রায় ১২ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা। গত রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এই নতুন দাম কার্যকর হলেও বাজারে এর সুদূরপ্রসারী ধাক্কায় দিশেহারা সাধারণ ভোক্তা ও পরিবহন খাতের পেশাজীবীরা।
এলপিজির দাম হুট করে এতটা বাড়ার পেছনের মূল কারণ ব্যাখ্যা করেছে বিইআরসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর অক্টোবর মাসের প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস বা সিপি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অক্টোবরে প্রোপেনের দাম প্রতি টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের দাম ৭৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ৩৫ ও ৬৫ অনুপাতে প্রোপেন ও বিউটেনের এই মিশ্রণে গড় সৌদি সিপি প্রতি টন ৭১২ দশমিক ৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা আগের মাসের তুলনায় টনপ্রতি প্রায় ৬৪ ডলার বেশি।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় বাজারে দাম বাড়ানোর পেছনে আরেকটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট কস্ট ও ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম। সেপ্টেম্বর মাসে এলপিজি আমদানির জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলার ধরা হলেও অক্টোবরের মূল্য সমন্বয়ে তা বাড়িয়ে ২৫০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে শুধু পরিবহন ও আমদানির আনুষঙ্গিক খরচই টনপ্রতি ৯০ ডলার বেড়েছে। এর সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারের হিসাব যুক্ত হয়ে গ্রাহকদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির লেশমাত্র নেই। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। দেশের বেশিরভাগ এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য সাধারণ মানুষকে গুণতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে শুরু করে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
সরকারি ঘোষণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের এই আকাশ-পাতাল ব্যবধান নগরবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও তীব্র করে তুলেছে। রান্নার গ্যাসের এই চড়া দামের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাসাবাড়ির পাশাপাশি হোটেল-রেস্তোরাঁর মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও।
অন্যদিকে এলপিজির বাজার কেন এমন অস্থির হয়ে উঠল, তা নিয়ে শুরু হয়েছে বহুমুখী পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকেই আমদানিকারকরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন এবং ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কিছু ডিপো থেকেও সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। পক্ষান্তরে, কৃত্রিম সংকট তৈরির এই অভিযোগ কঠোরভাবে অস্বীকার করেছেন আমদানিকারকরা।
তাদের পাল্টা দাবি, বাজারে এই বিশৃঙ্খলার জন্য মূলত ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারাই দায়ী। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের এই দোষারোপের রাজনীতির যাঁতাকলে পড়ে শেষ পর্যন্ত বাড়তি দামের বোঝা টানতে হচ্ছে দেশের কোটি সাধারণ মানুষকে।
এসএইচ