নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন ও বকেয়া পরিশোধের অর্থ জোগাতে বিশেষ ট্রেজারি বিল ছেড়ে জরুরি ঋণ নিচ্ছে সরকার। রাজস্ব ঘাটতির মুখে দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতে সম্প্রতি ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ এই বিলের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের স্থিতি ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর আগের তিন মাসের বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন দেওয়ার কথা রয়েছে সরকারের। বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাত মিলিয়ে দেশে বর্তমানে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ ২৫ হাজার পেনশনভোগী রয়েছেন।
নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়বে।
ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে চলতি অক্টোবর মাসে সরকারের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়, যা একক মাস হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ। এর আগে জুলাইয়ে ৫৬ হাজার কোটি, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছিল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার পৌঁছেছে ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, রাজস্ব আয় আশানুরূপ না হওয়ায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং এই চাপ কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার শরিয়াহভিত্তিক সুকুক বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা দৈনিক পরিচালন ব্যয় ও বেতন মেটাতে স্বল্পমেয়াদি বিশেষ বিলের আশ্রয় নেওয়াকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন। সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী উল্লেখ করেছেন যে রাজস্ব বাড়াতে না পেরে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ঋণভার দ্রুত বাড়ছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় সরকার ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধের চক্রে পড়েছে এবং মেয়াদপূর্তির পর এসব বিল-বন্ড পুনরায় রোলওভার করতে বাধ্য হবে।
এসএইচ