অদৃশ্য কারসাজিতে এলপিজির দাম ছাড়াল ২ হাজার টাকা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম
ফাইল ছবি

রান্নার নিত্যসঙ্গী তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে ফের চরম অস্থিরতা নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এক মাসের ব্যবধানে ১২ কেজি ওজনের একটি বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাঘরের বাজেট রীতিমতো এলোমেলো হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাজারের মূল্যবৃদ্ধির এই ঢেউ কি কেবল স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সমীকরণ, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কোনো অসাধু চক্রের অদৃশ্য কারসাজি?

সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় বিইআরসি নতুন এই মূল্যহার ঘোষণা করে, যা ওই দিন রাত আটটা থেকেই কার্যকর হয়েছে। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, নভেম্বর মাসের জন্য প্রতি কেজি বেসরকারি এলপিজির দাম ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে অক্টোবরে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে মোট ৪৭৫ টাকা। এছাড়া সরকারি ১২ দশমিক ৫০ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৬০ টাকা এবং অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৯১ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিইআরসির যুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের আন্তর্জাতিক গড় মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় মূল্য ১২৩ টাকা ৪৬ পয়সা নির্ধারণের কারণেই এই মূল্যসমন্বয় করতে হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, বিইআরসির এই কাগজকলমে নির্ধারিত দাম কি আদৌ বাজারে কার্যকর হয়? দেশের প্রায় ৮৩ লাখ এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, সরকারি বা নির্ধারিত দামের চেয়ে সবসময়ই তাদের অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হয়। ১ হাজার ৮৩৭ টাকার সিলিন্ডার ইতোমধ্যে বাজারে ২২শ থেকে ২৩শ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। নতুন করে দাম বাড়ানোর ফলে খুচরা বাজারে এই পকেট কাটা আরও তীব্র আকার ধারণ করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি একচেটিয়া সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। ২৯টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোম্পানি থাকলেও গত সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাজারের প্রায় ৬৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র চারটি কোম্পানি—ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, মেঘনা ও যমুনা। এই অলিখিত একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত। উপরন্তু, আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের সংগঠন ‘লোয়াব’ আরও ২৬৬ থেকে ৩০০ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) এক প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও এর চূড়ান্ত সত্যতা এখনো আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়নি, তবে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি ও ক্ষোভ যে মিথ্যে নয়, তা প্রতিদিনের বাজারচিত্রেই স্পষ্ট। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ও কারসাজিকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, গণশুনানির তথ্য ও নথি পর্যালোচনা করেই এই দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের সাফ কথা-কাগজে-কলমে মূল্য নির্ধারণের চেয়ে বাজারে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর তদারকি বেশি জরুরি।

কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে এবং সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাজার মুক্ত না করা হলে, এলপিজির এই আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। সাধারণ জনরোষ ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে রান্নাঘরের জ্বালানির দাম বৃদ্ধি জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যার স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

এসএইচ