মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা নান্দনিক ফ্লাইওভার-রাজধানী ঢাকার দৃশ্যপট বদলেছে অনেকটাই। বাইরে থেকে শহরের চকচকে রূপ নজর কাড়লেও নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের মানোন্নয়নে তা সামান্যই ভূমিকা রাখছে। ফলে বড় বড় অবকাঠামো দৃশ্যমান হওয়ার পরও বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান থেকে যাচ্ছে একদম তলানিতে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) সর্বশেষ বাসযোগ্যতার সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপলির মতোই আশঙ্কাজনক।
গত ২২ বছর ধরে পরিচালিত ইআইইউর এই মূল্যায়নে বাসযোগ্যতার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড অবকাঠামো খাত। ১০০ নম্বরের মধ্যে এই খাতে ঢাকা পেয়েছে মাত্র ২৭। আপাতদৃষ্টিতে যোগাযোগব্যবস্থায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও মূলত গণপরিবহনের মূল ভিত্তি বাসব্যবস্থা পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রিত ও বিশৃঙ্খল রয়ে গেছে।
হাতে গোনা কয়েক লাখ মানুষের জন্য মেট্রোরেল সুবিধাজনক হলেও কোটি মানুষের জন্য এখনো কোনো বিশ্বমানের নগর বাসব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে যত্রতত্র অটোরিকশা ও ইজিবাইকের আধিক্যে ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার বদলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে তীব্র যানজট ও যাত্রী দুর্ভোগ।
টেলিযোগাযোগ খাতের দুর্বলতাও ঢাকার বাসযোগ্যতার মান নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। দেশের অধিকাংশ মানুষের হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট থাকলেও নেটওয়ার্কের নিম্নমান দৈনন্দিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোরজির কথা বলা হলেও গ্রাহকরা মূলত টুজি মানের সেবা পাচ্ছেন।
পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম ও আধুনিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর অভাবে প্রতিনিয়ত কল ড্রপ ও ধীরগতির ইন্টারনেটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নাগরিক ও বিদেশি দর্শনার্থীদের। প্রতিবেশী দেশগুলো এ খাতে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও বিটিআরসির শিথিলতায় টেলিযোগাযোগ সেবা ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে।
একইভাবে আবাসন ও পানি সরবরাহেও গুণগত মানের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ঢাকার মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষের নিজস্ব ঘরবাড়ি রয়েছে, আর বাকি বিশাল এক অংশ বাস করছেন ভাড়া বাসায় কিংবা বস্তিতে।
একটি মানসম্মত নগরে বাস করার জন্য যেসব উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, উদ্যান ও জলাশয় থাকা প্রয়োজন, তার অধিকাংশই রাজধানী থেকে হারিয়ে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের পাশাপাশি বাসাবাড়ির ট্যাপে সরবরাহকৃত পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনে দূষণ ও দৈনিক লোডশেডিংয়ের কারণে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তাও ব্যাহত হচ্ছে।
নগর পরিচালনায় ভুল উন্নয়ন দর্শন, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর চাপে বারবার নগর পরিকল্পনা পরিবর্তন এবং সরকারি তদারকি সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাই ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলার প্রধান বাধা।
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) নীতিমালার সাথে বারবার অন্যায্য আপস করার ফলেই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ সত্ত্বেও ঢাকার নাগরিক জীবন আজ কাঠামোগত সংকটে বন্দি। চকচকে মেগা প্রকল্পের বাইরে মৌলিক সেবাগুলোর আমূল সংস্কার না হলে ঢাকার বাসযোগ্যতার সূচকে উন্নতি অর্জন একপ্রকার অসম্ভব।
এসএইচ