অনর্থক কথা পরিহার জরুরি

  • হাফেজ তাওসীফ আহমাদ | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২১, ২০২১, ০৪:৩০ পিএম

ঢাকা : রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া শিক্ষা আমাদের জন্য সদা-বিদ্যমান কল্যাণের  উদ্যান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিটি কথাই ছিল মানবজাতির জন্য এক সারপ্রাইজ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন  ‘যেই ব্যক্তি চুপ থাকে সে নাজাত পায়।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-২৭৯) আবু মূসা (রা.) হতে বর্ণিত, “তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল সর্বোত্তম মুসলিম কে?’ তিনি বললেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।” (বুখারি, হাদিস নং-১১) মুসলিমজাতি এতোটাই নৃশংস হয়ে গেছে যা বলাবাহুল্য! এক মুসলিম ওপর মুসলিমের কথায় নিরাপদ থাকা বড়ই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাহল ইবনে সাদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী (অঙ্গ জিভ) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী (অঙ্গ গুপ্তাঙ্গ) সম্বন্ধে নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।’ (বুখারি, হাদিস সং-৬৪৭৪) এই হাদিসটি থেকে যেন আমরা বিমূঢ় না হয়ে যায় এদিকে সাবধানতা ও সচেতন থাকা চাই।

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘বান্দা আল্লাহতায়ালার সন্তোষজনক এমন কথা অন্যমনস্ক হয়ে বলে ফেলে, যার ফলে আল্লাহ তার মর্যাদা উন্নীত করে দেন। আবার কখনো বান্দা অন্যমনস্ক হয়ে আল্লাহর অসন্তোষজনক এমন কথা বলে ফেলে, যার ফলে সে জাহান্নামে গিয়ে পতিত হয়।’ (বুখারি, হাদিস নং-৬৪৭৮) সাবধান! আপনি এমন কোনো কথা বলবেন না যেটা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অসন্তোষজনক হয়ে দাঁড়ায়। কিছু মানুষ আছে যা কেবল মানুষকে খুশি করবার জন্য মুখের তোড় সামলে রাখে না, মনে যা চাইবে সেটাই মানুষের সামনে উপস্থাপনা করবে, হোক সেটা আল্লাহতায়ালার কাছে  সন্তুষ্টি। হোক সেটা আল্লাহতায়ালার কাছে অসন্তুষ্টি।

উবাদাহ বিন সামেত বলেন, একদা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সওয়ারিতে সওয়ার হয়ে কোথাও বের হলেন। সঙ্গে ও সম্মুখে ছিলেন তার সাহাবিবৃন্দ। মুআজ বিন জাবাল (রা.) তাঁর উদ্দেশে বল্লেন, ‘হে আল্লাহর নবী! খুশি মনে আমাকে অগ্রণী হয়ে বলতে অনুমতি দেবেন কি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ অতঃপর মুআজ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। সকলে চলতে শুরু করলে মুআজ বললেন, ‘আমার পিতা আপনার জন্য  কোরবান হোক-আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যে, আপনার থেকে আমাদের (মৃত্যুর) দিন আগে করুন। যদি কিছু হয়ে যায়, আর ইনশাআল্লাহ কিছু হবে না। আপনার পরে আমরা কোন কর্মগুলো করব?’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নীরব থাকলেন। মুআজ বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদ?’ অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘জিহাদ খুব উত্তম জিনিস। কিন্তু এর চেয়ে সহজ জিনিস আছে।’ মুআজ বললেন, ‘তাহলে রোজা ও সাদকাহ?’ বললেন, রোজা ও সাদকাহ উত্তম জিনিস। অতঃপর মুআজ মানুষের প্রায় সকল সৎকর্মের কথা উল্লেখ করলেন। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বার বারই বললেন, এর চেয়েও উত্তম কর্ম আছে। অবশেষে মুআজ বললেন, ‘আমার পিতামাতা আপনার জন্য কোরবান হোক, এর চেয়ে উত্তম আর আছে কি?’ তদুত্তরে তিনি নিজ মুখের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, মঙ্গল ব্যতীত অন্য বিষয়ে চুপ থাকা। মুআজ বললেন, ‘আমরা জিবে যে কথা বলি, তাতেও কি আমাদেরকে কৈফিয়ত করা হবে?’ তা শুনে তিনি মুআজের জানুতে চপেটাঘাত করে বললেন, হে মুআজ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! মানুষের জিভে বলা কথা ছাড়া অন্য কিছু কি তাদেরকে নাক ছেঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে? সুতরাং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী ব্যক্তির উচিত। উত্তম কথা বলা নতুবা মন্দ বলা হতে চুপ থাকা। তোমরা উত্তম বল, লাভবান হবে এবং মন্দ বলা হতে চুপ থাকো, নিরাপত্তা লাভ করবে।’ (হাকেম, হাদিস নং-৭৭৭৪)

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আদম সন্তান যখন সকালে উপনীত হয়, তখন তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিভকে অত্যন্ত বিনীতভাবে নিবেদন করে যে, ‘তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কারণ, আমাদের ব্যাপারসমূহ তোমার সাথেই সম্পৃক্ত। যদি তুমি সোজা সরল থাক, তাহলে আমরাও সোজা-সরল থাকব। আর যদি তুমি বক্রতা অবলম্বন কর, তাহলে আমরাও বেঁকে বসব।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-২৪০৭) আপনি যদি গুনাহ থেকে বিরত থাকতে চান তাহলে ঘুম থেকে উঠা নিয়ে রাতে ঘুমানো পর্যন্ত আপনার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ রাখেন।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা পবিত্র  কোরআন ইরশাদ করেন ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।’ (সরাি ক্বাফ, আয়াত-১৮) সুতরাং যে কথায় উপকার আছে বলে স্পষ্ট হয়, সে কথা ছাড়া অন্য সব কথা হতে নিজ জিহ্বাকে সংযত রাখা প্রত্যেক ভারপ্রাপ্ত মুসলিম ব্যক্তির উচিত। যেখানে কথা বলা ও চুপ থাকা দুটোই সমান, সেখানে চুপ থাকাটাই সুন্নাত। কেননা, বৈধ কথাবার্তাও অনেক সময় হারাম অথবা মাকরূহ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। অধিকাংশ এরূপই ঘটে থাকে। আর (বিপদ ও পাপ থেকে) নিরাপত্তার সমতুল্য কোনো বস্তু নেই। আসুন, নিজেদের জিহ্বাকে প্রতিষ্ঠিত করি এক আল্লাহতায়ালা সন্তুষ্টির সন্তুষ্টচিত্তে। এক মুসলিম ওপর মুসলিমের কথায় যেন নিরাপদ থাকতে পারি। আল্লাহ পাক আমাদের কবুল করুন। আমীন।

লেখক : শিক্ষার্থী, দত্তবাড়ী দারুল হিফজ ইসলামিয়া মাদ্রাসা
tawsifahmed507@gmail.com