কোরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও শিক্ষা: ত্যাগের মহিমা

  • হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মে ১, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
ফাইল ছবি

 

কোরবানি শব্দের অর্থ হচ্ছে নিকটবর্তী হওয়া বা সান্নিধ্য লাভ করা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। অতএব আপনি আপনার রবের সন্তুষ্টির জন্য সালাত কায়েম করুন ও তাঁর নামে কোরবানি করুন’ (সুরা কাউসার: ১-২)। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কোরবানি করে না, তাদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করবে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে’ (আহমদ ও ইবনে মাজাহ)।

কোরবানির ইতিহাস

মানব বসতির শুরু থেকেই কোরবানির প্রচলন শুরু হয়েছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদি পিতা ও নবী হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে এই ইতিহাসের সূচনা। আল্লাহর বিধান মানা নিয়ে দ্বন্দ্বে তারা দুজনেই কোরবানি পেশ করেছিলেন। তাদের মধ্যে মুমিন ও আল্লাহভীরু হাবিলের কোরবানি কবুল হয়েছিল, কিন্তু অবাধ্য কাবিলের কোরবানি কবুল হয়নি। মূলত আল্লাহ তাআলা কেবল পরহেজগারদের কোরবানিই কবুল করেন।

তবে বর্তমানে মুসলিম সমাজে কোরবানির যে প্রচলন, তা মূলত মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দেখানো পথ বা সুন্নাত। শতবর্ষ বয়সে আল্লাহ তাআলা তাঁকে যে সন্তান দান করেছিলেন, সেই কলিজার টুকরা হজরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর আদেশে কোরবানি দিতে উদ্যত হওয়ার সেই অনন্য ত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আজও কোরবানি প্রচলিত।

ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই কঠিন পরীক্ষা

হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়েছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দিতে। পর পর তিনবার একই স্বপ্ন দেখার পর তিনি অনুধাবন করলেন, কলিজার টুকরা পুত্র ইসমাইল (আ.) ছাড়া তাঁর প্রিয় আর কোনো বস্তু নেই। তিনি যখন তাঁর কিশোর পুত্রকে স্বপ্নের কথা জানালেন, তখন সেই ধৈর্যশীল পুত্র উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবে পাবেন।’

পিতা যখন পুত্রকে কোরবানির জন্য কাত করে শুইয়ে দিলেন এবং ছুরি চালালেন, তখন মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে ডেকে বললেন, ‘হে ইব্রাহিম! তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে রূপ দিয়েছ।’ মূলত এটি ছিল পিতা ও পুত্রের আনুগত্যের এক কঠিন পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়ে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন এবং ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে সেটি জবেহ হলো। সেই থেকে পশু কোরবানির এই বিধান কিয়ামত পর্যন্ত জারি রয়েছে।

কোরবানির শিক্ষা ও গুরুত্ব

কোরবানি কোনো জবরদস্তির বিষয় নয়; বরং এটি স্বেচ্ছায় প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় বস্তু ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করে। মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় মোহ হলো অর্থ-সম্পদ ও সন্তান। কোরবানির মাধ্যমে এই মোহ ত্যাগের প্রশিক্ষণ পাওয়া যায়। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিনে মানবসন্তানের কোনো নেক আমলই আল্লাহর কাছে কোরবানি করার চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়।

কোরবানি মানুষের ইমান ও তাকওয়া বৃদ্ধি করে। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন ত্রুটিমুক্ত ও উত্তম প্রাণী কোরবানি করতে। কোরবানির প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি পাওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

আমাদের করণীয়

কোরবানি সচ্ছল মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব। কোরবানির গোশতের ওপর আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-মিসকিনের হক রয়েছে। খেয়াল রাখতে হবে সমাজের কোনো মানুষ যেন এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। পশুর চামড়া বা এর মূল্য কেবল জাকাতের হকদাররাই পাওয়ার যোগ্য। কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য রক্ত বা মাংস নয়, বরং এর পেছনের তাকওয়া ও ত্যাগের মহিমা। মহান আল্লাহ আমাদের ত্যাগের এই শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।

এসএইচ