বাংলাদেশ ক্রিকেটে ওয়ানডে ছিল গর্বের জায়গা, ছিল আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। এই ফরম্যাটেই একসময় নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছে বাংলাদেশ, গড়েছে স্মরণীয় সব জয়, বড় দলগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সাহস দেখিয়েছে। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সেই ওয়ানডেতেই এখন উল্টো পথে হাঁটছে দল। যে ফরম্যাটে ধৈর্য, পরিকল্পনা আর পরিস্থিতি বুঝে খেলার সামর্থ্য সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেখানেই যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় বোধ।
শেষ ৫ ওয়ানডের ৪টিতেই হার! জিম্বাবুয়ের কাছে ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হারের পর ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে আবার হার। এবার আফগানিস্তানের কাছে ৭ উইকেটের অসহায় আত্মসমর্পণ। শারজাহতে ১৬০ রানে অলআউট হয়ে বাংলাদেশ ম্যাচ হেরেছে ৩৫.৩ ওভারে। তাতে ফাইনালের স্বপ্ন পুরোপুরি ধূলিস্যাৎ। শূণ্য হাতেই ফিরতে হচ্ছে বাড়ি।
পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে পঞ্চাশ ওভার ব্যাটিং করার মানসিকতাই যেন নেই বাংলাদেশের। এই বছর ১৪ ওয়ানডের ৮টিতেই পঞ্চাশ ওভার খেলার আগেই অলআউট বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে আজকের ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংস টিকে ৪১.২ ওভার। এর আগে জিম্বাবুয়ে বিপক্ষে ৩৩.৪ ওভারেই অলআউট তাওহীদ হৃদয়ের দল।
উইকেটে টিকে থাকা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কিংবা বিপর্যয়ের মুহূর্তে দায়িত্ব নিয়ে ইনিংস গড়ে তোলার যে তাগিদ, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না ব্যাটিংয়ে। বরং উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো, দায়িত্বজ্ঞানহীন শট নির্বাচন আর চাপের মুখে ভেঙে পড়ার প্রবণতা বারবার সামনে আসছে। মনে হচ্ছে, ইনিংসটা কীভাবে শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে হবে, সেই মৌলিক পরিকল্পনাটাই যেন হারিয়ে ফেলেছে দল।
এ যেন কেবল ব্যাটিং ব্যর্থতা নয়, দায়সারা মানসিকতারও প্রতিচ্ছবি। ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রতিটি বলের আলাদা গুরুত্ব আছে, প্রতিটি উইকেটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ম্যাচের গতিপথ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা। অথচ সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করার বদলে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে দেখা যাচ্ছে অস্থিরতা, সিদ্ধান্তহীনতা আর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা।
কেউ পরিস্থিতি সামলে ইনিংস গড়ার দায়িত্ব নিচ্ছেন না, কেউ আবার ক্রিজে থিতু হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলতে গিয়ে দলকে আরও বিপদে ফেলছেন। ব্যক্তিগত ব্যর্থতা তখন আর ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা হয়ে উঠছে পুরো দলের ভঙ্গুরতার প্রতিচ্ছবি। সৌম্য, শান্ত, সাইফ, তাওহীদ কিংবা তানজিদ, মিরাজদের ব্যর্থতা তা-ই প্রমাণ করে।
আর ব্যাট-বলের এই অসহায় আত্মসমর্পণে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভঙ্গুর আত্মবিশ্বাসের ছবি। প্রতিপক্ষের সামান্য চাপে যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের পরিকল্পনা। শুরুতে উইকেট পড়লে ঘুরে দাঁড়ানোর বিশ্বাস নেই, মাঝের ওভারে রান আটকে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ধৈর্য নেই, আবার বোলিংয়ে প্রতিপক্ষের জুটি জমে উঠলে সেই ছন্দ ভাঙার কার্যকর কৌশলও চোখে পড়ে না।
একের পর এক ভুলের পুনরাবৃত্তি বুঝিয়ে দিচ্ছে, সমস্যা কেবল দক্ষতার ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক দৃঢ়তা, ম্যাচের পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতা এবং নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস। সবকিছুতেই যেন বড়সড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে হতাশার বিষয়, ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্যের ইতিহাস একেবারে শূন্য থেকে শুরু হয়নি। এই ফরম্যাটেই দলটি শিখেছে কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই করতে হয়, কীভাবে ধৈর্য ধরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে হয়, কীভাবে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা, সেই লড়াকু মানসিকতা কোথায় হারিয়ে গেল? কেন বারবার একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে? কেন ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরের ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ দেখা যাচ্ছে না? প্রশ্নগুলো এখন আর কেবল মাঠের পারফরম্যান্স ঘিরে নয়, বরং বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের সামগ্রিক মানসিকতা ও প্রস্তুতি নিয়েও।
পরাজয় ক্রিকেটেরই অংশ। ভালো দলও হারে, খারাপ দিন আসে, পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। কিন্তু হারের চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, কীভাবে হারছে বাংলাদেশ। লড়াই করে হারলে সেখানে ঘুরে দাঁড়ানোর উপাদান থাকে, ভুল থেকে শেখার সুযোগ থাকে। কিন্তু যখন ব্যাটিংয়ে দায়িত্বহীনতা, বোলিংয়ে অসহায়ত্ব আর মাঠের খেলায় আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি একসঙ্গে প্রকট হয়ে ওঠে, তখন সেই হার আর নিছক একটি ম্যাচের ফল থাকে না। তা হয়ে ওঠে গভীরতর সংকটের ইঙ্গিত।
একসময় ওয়ানডে ছিল বাংলাদেশের গর্বের জায়গা। সেই গর্ব ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু বড় জয়ের অপেক্ষায় থাকলে হবে না। ফিরিয়ে আনতে হবে পঞ্চাশ ওভার লড়াই করার মানসিকতা, উইকেটে টিকে থাকার ধৈর্য, পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার বুদ্ধিমত্তা এবং নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস।
নইলে দায়সারা মানসিকতা আর ভঙ্গুর আত্মবিশ্বাসের এই চক্রে ঘুরপাক খেতে খেতে পরাজয়ের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে। আর বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের গৌরবময় অতীত তখন বর্তমানের অনুপ্রেরণা না হয়ে ক্রমেই হয়ে উঠবে এক দীর্ঘশ্বাসের নাম।
এম