• ঢাকা
  • শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

রাজশাহীতে বাণিজ্যিক আঙুর চাষে নতুন সম্ভাবনা  


রাজশাহী ব্যুরো অক্টোবর ২, ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম
রাজশাহীতে বাণিজ্যিক আঙুর চাষে নতুন সম্ভাবনা   

ছবি: প্রতিনিধি

 আম, লিচু, মাল্টা কিংবা ড্রাগনের পর এবার রাজশাহীর মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। জেলার পবা, গোদাগাড়ী, দুর্গাপুর ও বাগমারাসহ বিভিন্ন এলাকায় তরুণ উদ্যোক্তারা বিদেশি জাতের আঙুরের বাগান গড়ে তুলছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, পলিশেড ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চাষে সাফল্য পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এ ফল চাষে আগ্রহও বাড়ছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্থানীয় বাজারে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আঙুর চাষ নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

 সম্প্রতি পবা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি কংক্রিটের খুঁটির ওপর মাচা তৈরি করে বেড়ে উঠছে আঙুরের গাছ। দূর থেকে দেখলে এটি সাধারণ কোনো ফলের বাগান মনে হলেও কাছে গেলেই চোখে পড়ে ঝুলে থাকা সবুজ আঙুরের থোকা। বাগান ঘিরে কৌতূহল তৈরি হয়েছে স্থানীয় কৃষক ও দর্শনার্থীদের মধ্যেও।

 বসন্তপুর ও বায়া এলাকায় যৌথভাবে আঙুর চাষ করছেন তরুণ উদ্যোক্তা মাহবুব ও সম্রাট। সম্রাট জানান, বসন্তপুরে চার বিঘা এবং বায়া এলাকায় এক বিঘা জমিতে তাঁরা আঙুরের বাগান করেছেন। বাগানে রয়েছে বাইকুনুর, অ্যাপোলো, দাসুনিয়া ও অস্ট্রেলিয়ান কিংসহ কয়েকটি জাত।

 সম্রাট বলেন, আঙুর চাষ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও নাটোরের বিভিন্ন বাগান ঘুরে তাঁরা অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। এসব বাগান দেখেই বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের স্বপ্ন তৈরি হয়। নিজের উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্য থেকেই এ চাষে নামেন তিনি।

 তবে এ চাষে শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানান তিনি। সম্রাটের ভাষ্য, ফলন পাওয়ার আগেই প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। গাছ লাগানোর পর নিয়মিত পরিচর্যা, ছাঁটাই, মাচা তৈরি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়। তবে গাছ উৎপাদনে আসার পর কয়েক বছর ধরে ফলন পাওয়া যায়।

 তাঁর বাগানে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০টি চারা রোপণ করা হয়েছে। রোগবালাই থেকে গাছ রক্ষা করে যথাযথ পরিচর্যা করতে পারলে দীর্ঘ সময়, এমনকি প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়ার আশা করছেন উদ্যোক্তারা।

 রাজশাহীর একজন আঙুরচাষি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চলতি মৌসুমে তাঁর বাগানের ৩৬০টি গাছ থেকে প্রায় ৭ হাজার কেজি আঙুর উৎপাদন হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা। এ ধরনের ফলন ও বাজারদর অন্য কৃষকদেরও আঙুর চাষে উৎসাহিত করছে।

 কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় চার হেক্টর জমিতে আঙুরের আবাদ হচ্ছে। এ চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৩০ থেকে ৩২ জন কৃষক। নতুন উদ্যোক্তারা বাগান পরিদর্শন করে চাষের পদ্ধতি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছেন।

 বসন্তপুরের বাগান দেখতে আসা নতুন কৃষক দুলাল বলেন, ‘আমাদের মাটিতে আঙুর হবে কি না, সেটা দেখতে এসেছি। পরীক্ষামূলকভাবে দুই-তিনটি চারা লাগাব। গাছগুলো ভালো হলে আমরাও বাণিজ্যিকভাবে চাষের কথা ভাবব।’

 কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহীতে এর আগে বিভিন্ন সময়ে আঙুর চাষের চেষ্টা হলেও প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায়নি। বর্তমানে আবহাওয়ার পরিবর্তন, উন্নত জাতের ব্যবহার, পলিশেড ও আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তির কারণে পরিস্থিতি বদলেছে। ফলে শখের চাষ পেরিয়ে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

 রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘রাজশাহী জেলায় বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় চার হেক্টর জমিতে আঙুরের চাষ হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ জন কৃষক জড়িত। আবাদ বাড়ানো গেলে এবং স্থানীয় বাজার ধরা গেলে বাইরের দেশ থেকে আঙুর আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।’

 কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কিছু এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষের উপযোগিতা পাওয়া গেছে। বাণিজ্যিকভাবে চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বড় পরিসরে আবাদ বাড়ানোর আগে জাত নির্বাচন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, বাজারজাতকরণ ও উৎপাদন খরচ-এসব বিষয়ে কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন।

 কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া গেলে রাজশাহীর মাটিতে আঙুর চাষ শুধু পরীক্ষামূলক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি হয়ে উঠতে পারে লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষির নতুন ক্ষেত্র।

এসএইচ 

Link copied!