ছবি: সংগৃহীত
ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌরসভার বাইতুল মাহফুজ পুরাবাড়িয়া মোড় জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মোজাহিদুল ইসলামকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। জুমার খুতবায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘স্বৈরাচার’ হিসেবে উল্লেখ করার অভিযোগ তুলে মসজিদ কমিটি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ধর্মীয় আলোচনার সময় ঘটা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে দেখা যায়, গত ২৩ অক্টোবর জুমার খুতবায় ‘মূর্তি ও ভাস্কর্যের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং তা থেকে মুসলমানদের উত্তরণ’ শীর্ষক স্পর্শকাতর বিষযে আলোচনা করছিলেন খতিব মাওলানা মোজাহিদুল ইসলাম। আলোচনার এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের প্রসঙ্গ টেনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসন আমলের সমালোচনা করে তাঁকে ‘স্বৈরাচার’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর পরপরই রাজনৈতিক প্রভাব বলয় ও স্থানীয় সমর্থকদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হলে মসজিদ কমিটি তড়িঘড়ি করে তাঁকে অব্যাহতি দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনিক ও সামাজিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
দীর্ঘ সময় ধরে গণমাধ্যমের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব একটি সংবেদনশীল বিষয়। এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম ও মুসল্লি কামাল হোসেন জানান, খতিবের দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক নামাজ পরিচালনা নয়, বরং দ্বীনি ও সামাজিক সত্য তুলে ধরা। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই আলেম-ওলামাদের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের কারণে আলেম সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় খতিবের বক্তব্যে কোনো অমিল বা আপত্তি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত, কিন্তু হুট করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়।
ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাওলানা মোজাহিদুল ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করে জানান, বিষয়টি সম্পূর্ণ আলোচনার প্রয়োজনে উদাহরণ হিসেবে এসেছিল। মসজিদ কমিটির সভাপতি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মসজিদ কমিটির সভাপতি ফেরদৌস ভূঁইয়া খতিবকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত দাবি করে একক সিদ্ধান্তের কথা অস্বীকার করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি জানান।
মানবাধিকার ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিচারে এই ধরনের সিদ্ধান্ত মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ময়মনসিংহ জেলা মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট এএইচএম খালেকুজ্জামান জানান, বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শাপলা চত্বরের ঘটনা সহ নানা ইস্যুতে ওলামা সমাজের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
সেই প্রেক্ষাপট থেকে জুমার খুতবায় ক্ষোভের প্রকাশ ঘটা অস্বাভাবিক নয়। কোনো আলোচনার সুযোগ না দিয়ে বা কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে এভাবে হুট করে খতিবকে অব্যাহতি দেওয়া একটি অনভিপ্রেত দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ভাবমূর্তি রক্ষায় মসজিদ কমিটির এমন কঠোর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সহনশীল অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল।
এসএইচ







































