পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতির সঙ্গে পেরে উঠছে না আমলাতন্ত্র। দক্ষতা ও গতি- এই দুইয়ের সঙ্গে খাপখাওয়াতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কেউ কেউ।
পরিস্থিতি পাল্টাতে প্রশাসনের অন্যতম মূল জায়গা ‘পাওয়ার হাউস’ খ্যাত অতিরিক্ত সচিব পদে দক্ষ কর্মকর্তা যুক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। রাষ্ট্রীয় কাজে আরো গতি আনতে প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব পদে বড় ধরনের পদোন্নতি আসতে যাচ্ছে।
এই স্তরে পদোন্নতির জন্য ৩ শতাধিক যুগ্মসচিবের নথি এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের বাছাই কমিটি তথা সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) টেবিলে জমা পড়েছে। ইতোমধ্যেই এসএসবি কর্মকর্তাদের অতীত পোস্টিং রেকর্ড পদোন্নতির সময় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে শর্ট লিস্ট করছেন।
দ্রুতই এই পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, রাজনৈতিক কিংবা অন্যান্য পরিচয় যেন পদোন্নতির ক্ষেত্রে দক্ষতা, যোগ্যতাকে ছাপিয়ে না যায়। এমন কিছু হলে আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। অতীতের মতো উপযুক্ত কর্মকর্তারা পদোন্নতি বঞ্চিত হলে সরকারের কাজে প্রত্যাশিত গতি ফিরবে।
নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরে তারেক রহমান যে ঘোষণা করেছিলেন, ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’; প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রীতিমতো সচিবালয়ে অফিস করছেন তিনি। এসএসবি প্রধান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গনি এরই মধ্যে কয়েকটি সভা করে কর্মকর্তাদের পদোন্নতির তথ্য যাচাই-বাছাই করেছেন। আরো কয়েকটি সভা করবে বলেও জানা গেছে। এরপর চূড়ান্ত তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর জিও জারি করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী জানিয়েছেন, ইতোমধ্যেই পদোন্নতির কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাজও শুরু হয়েছে। এসএসবি মাধ্যমে সুপারিশ আসে। আশা করছি মেধাবী ও যোগ্যরা পদোন্নতি পাবে।
জানা গেছে, প্রশাসনে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২১ বিসিএস ব্যাচকে সামনে রেখে এ পদোন্নতি দিতে যাচ্ছে সরকার। ২০০৩ সালে ৩১ মে যোগদান করেছিল এই ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তখন প্রশাসন ক্যাডারে ২ শতাধিক নিয়োগ পেয়েছিল। বতর্মানে এই ২১ ব্যাচ থেকে ১৭০ জনের মতো কর্মকর্তার তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও ২০ ব্যাচসহ অন্যান্য লেফট আউট হিসেবে আছেন আরো দেড় শতাধিক কর্মকর্তার নাম। এর মধ্যে ২০ ব্যাচই বেশি। সর্বশেষ গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ বছর জানুয়ারি মাসে নির্বাচনের আগে আগে অতিরিক্ত সচিব পদে ১১৮ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে ২০ ব্যাচ থেকে প্রায় ১৮০ কর্মকর্তা বঞ্চিত হন।
বিগত শেখ হাসিনার সরকারের আমলে জেলা প্রশাসক থাকার কারণে অনেক কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যেই বাধ্যতামূলক অবসরও দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো এই ২০ ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা আশায় আছেন পদোন্নতির। সব মিলে ৩ শতাধিক কর্মকর্তার চাকরির অতীত বর্তমান তথ্য যাচাই-বাছাই করছে এসএসবি। কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের সার্বিক তথ্য-উপাত্ত বা ‘ডসিয়ার’ চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে সরকারের এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি।
‘সরকারের উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং সচিব পদোন্নতি বিধিমালা, ২০০২’ অনুযায়ী অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে যুগ্মসচিব হিসেবে অন্তত দুই বছরসহ মোট চাকরির মেয়াদ ২২ বছর হতে হবে। ২০২২ সালে যুগ্মসচিব পদোন্নতি পান ২১ ব্যাচের কর্মকর্তারা।
এদিকে পদোন্নতির আশায় গত কয়েকদিন ধরে পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তারা এসএসবি সদস্যদের কাছে গিয়ে সালাম বিনিময় করে নিজেদের পরিচয় দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে জনপ্রশাসনে এ ভিড় একটু বেশিই। অনেকে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, কেউ সচিবের কাছে যাচ্ছেন, দোয়া চাচ্ছেন। অনেকে অতীত জীবনের এই সরকারের দলের জন্য রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরছেন। বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকর্তারও দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। যাদের নামে মামলা বিভাগীয় মামলা আছে তারাও ঘুরছেন। কারও কারও নামে হওয়া বিভাগীয় মামলার পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি থেকে নাকচ হলেও পদোন্নতির জন্য সিনিয়র কর্মকর্তার দ্বারে দ্বারে ঘুরতে দেখা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অতিরিক্ত সচিবের বর্তমান পদ ৪১৮টি। সর্বশেষ পদোন্নতির পর অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ৪ শতাধিক। এর মধ্যে অনেকেই অবসরে যাচ্ছে আর পদের চেয়ে সংখ্যা কমে আসছে। অতিরিক্ত সচিবের স্থায়ী পদের চেয়ে এমনিতেই প্রশাসনে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি রাখা হয় সেখানে এখন কম আছে। এজন্য সচিবালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ে শূন্যতাও আছে বলে জানা গেছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের নামে দলীয় বিবেচনা যেন না করা হয়। প্রশাসনে মেধার ঘাটতি হলে দেশ সংকটে পড়ে। প্রশাসনে পদোন্নতি বদলি এসব নিয়ে নিরপেক্ষ আচরণটা শুরু করতে হবে কোনো না কোনো সরকারকেই। কে ডিসি ছিল, কার পিএস ছিল এসব না দেখে ওই ব্যক্তি কতটা প্রফেশনাল, কতটা দক্ষ এসবই যেন দেখা হয়। পদোন্নতি না পেলে কষ্টটা কেমন হয় নিশ্চয়ই এসএসবি বোর্ডের অনেকেই জানেন। কোনো ব্যাচমেটের কথা শুনে বা কারও ব্যক্তিগত আক্রোশ যেন কোনো প্রার্থীর ওপর না আসে।
বিনা কারণে কাউকে যেন বঞ্চিত করা না হয়। সৎ, কর্মদক্ষ, যোগ্য ও মেধাবীরা যাতে কোনোভাবে বঞ্চিত না হন সেই নিশ্চয়তা সরকারকেই দিতে হবে। পদোন্নতিতে কর্মকর্তারা আরো উৎসাহিত হবেন কাজে, বলেন তিনি। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
এম







































