• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

স্যালুট জানাই এমন গোৗরবময় সশস্ত্র বাহিনীকে


সোনালীনিউজ ডেস্ক নভেম্বর ২১, ২০২২, ০৯:৩৯ এএম
স্যালুট জানাই এমন গোৗরবময় সশস্ত্র বাহিনীকে

ঢাকা : বাংলাদেশ পৃথিবীর খুব স্বল্পসংখ্যক দেশগুলোর একটি, যারা সশস্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মহাশক্তিধর বর্বর শত্রুশক্তিকে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এই অর্জনের নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্ব আর বাংলার আপামর মানুষের অংশগ্রহণে মাত্র ৯ মাসে হানাদার সেনারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

৭১ এর মার্চ মাসে শুরু হওয়া যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এক সর্বাত্মক গণযুদ্ধে রূপ নেয়। যে যুদ্ধের সামরিক নেতৃত্ব দেন কিংবদন্তি সমর নায়ক তৎকালীন কর্নেল আতাউল গণী ওসমানী, সম্মুখভাগে থেকে ময়দানে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন পাকিস্তান সশস্র বাহিনী ছেড়ে পবিত্র দেশপ্রেমে উদ্দুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন বাংলার দামাল অকুতোভয় সেনারা।

১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বরে এসে নয়া মোড় নেয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এদিন বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সম্মিলিতভাবে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুগপৎ আক্রমণের সূচনা করে। এই দিনটির স্মরণে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ২১ নভেম্বরকে সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এর আগে ২৫ মার্চ সেনা, ১০ ডিসেম্বর নৌ এবং বিমানবাহিনী ২৮ সেপ্টেম্বর আলাদাভাবে দিবসগুলো পালন করত। পরে ২১ নভেম্বরের তাৎপর্য সমুন্নত রাখতে সম্মিলিত দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালনের পেছনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অন্যতম নিয়ামক। মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অবদানকে সাধারণ জনতার আত্মত্যাগের সঙ্গে একীভূত করে দেখা হয় এ দিনটিতে।

রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিকাশেরও অন্যতম প্রধান মাইলফলক এই ২১ নভেম্বর। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বড় আকারে বাইলেটারাল সম্পর্ক স্থাপন করে। ভারতের সেনাদের সঙ্গে যূথবদ্ধ হয়ে তারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণ সূচনা করে এবং এর ফলেই মাত্র ১৫ দিনের মাথায় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রথম স্বীকৃতি পায় (ভুটান ও ভারত)। নবতেজে উদ্দীপ্ত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও অকুভোয় সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের বিক্রমে এর মাত্র ১০ দিন পর পাকিস্তান বাহিনী যৌথ বাহিনীর কাছে কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

২১ নভেম্বর বাংলাদেশের সশস্র বাহিনী তো বটেই, আপামর জনতার জন্যও এক অনন্য দিন। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের অন্যতম মাইলফলক সূচিত হয়েছিল এই দিনে। তবে বাংলাদেশের সশস্র বাহিনী শুধু মুক্তিযুদ্ধের সময়ই যে এ যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তা কিন্তু নয়। বরং এর বেশ আগে থেকেই সেই প্রস্তুতি ছিল। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র অন্যতম আসামি কর্নেল শওকত আলী তার ‘সত্য মামলা আগরতলা’ গ্রন্থে জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মতিতে বাঙালি সেনাদের নিয়ে তারা বিপ্লবী সংস্থা গঠন করেছিলেন। যার লক্ষ্য ছিল একটি নির্দিষ্ট রাতে বিভিন্ন সেনানিবাসে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালানো এবং পাকি সেনাদের থেকে সেনানিবাসের দখল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার গঠন করা।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার যারা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাদের সম্মুখসারিতে সশস্র বাহিনীর বীরেরাও ছিলেন অন্যতম অগ্রবর্তী হিসেবে।

১৯৭২ সালে ৬৭৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য বিভিন্ন খেতাব অনুমোদন করা হয়। খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগই সামরিক বাহিনীর। যা তাদের শ্রদ্ধা জাগানিয়া বীরত্বের কথা আমাদের স্মরণ করায়।

মাত্রই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার হয়েছি আমরা। বিশ্ব নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় স্বর্ণোজ্জ্বল বিস্ফোরণের কাল অতিক্রম করছি। এই সময়ে নতুন বিশ্বের বাস্তবতায় আমাদের সশস্র বাহিনীও এগিয়ে যাচ্ছে।

শুধু মাতৃভূমি বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বজুড়ে আমাদের সশস্র বাহিনী এক অনন্ত আস্থার নাম। জাতির যেকোন সঙ্কটে সশস্র বাহিনীর ওপর আস্থা রাখে মানুষ। গত এক যুগে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন যজ্ঞেরও অন্যতম অংশীদার সশস্ত্র বাহিনী। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে সার্বিক উন্নয়নকাজে বাংলাদেশে দুর্নীতি শূন্যে নামিয়ে আনা যায়নি। কিন্তু সশস্র্র্র বাহিনীর প্রকৌশল ইউনিটের অধীন দুর্নীতি ও অপচয়মুক্ত এবং যথাসময়ে উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হচ্ছে একের পর এক। যার উদাহরণ হচ্ছে হাতিরঝিল, মাওয়অ একএসপ্রসওয়ে, কক্সবাজারের মেরিনড্রাইভ প্রভৃতি।

যেকোন দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সশস্র বাহিনী এগিয়ে আসে সবার আগে। দাঁড়ায় সাধারণ মনুষের পাশে।

জাতীয় নির্বাচন অসন্ন। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের অন্যতম আস্থার নাম সশস্র বাহিনী।

আমরা একটা কথা খুব শুনে থাকি-- বিশ্ব মান। আমাদের এটা বিশ্ব মানের, ওটা বিশ্বমানের না ইত্যাদি। কিন্তু নির্দ্ধিধায় বলা যায়, আমাদের সশস্র বাহিনী বিশ্ব মানের তো বটেই, এমনকি বিশ্বে যুদ্ধকবলিত অঞ্চল ও দেশগুলোয় শান্তিরক্ষায় অন্যতম নেতৃত্বদানকারী। তারা তাবৎ দুনিয়ায় জাতিসংঘের শান্তি মিশনে অংশ নিচ্ছে এবং সেসব মিশনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব প্রদান করছে, যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য গৌরবের। বাংলাদেশ এখন জাতিসংঙ্ঘের অধীনে শান্তিরক্ষি প্রেরণকারী শীর্ষতম দেশ। শান্তিরক্ষায় আমাদের সেনাদের দক্ষতা এবং মানবিক আচরণও অন্য যে কোনো দেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অনুকরণীয়।

এমন অনেক ঘটনা আছে যেসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে যুদ্ধ-বিগ্রহ কবলিত কোনো অঞ্চলে অন্য কোনো দেশের শান্তিরক্ষী থাকাবস্থায়ও পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি এমনকি দিন দিন অভনতি হয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে ওই বাহিনী সরিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী মোতায়েনের পর আশানুরূপ সাফল্য দেখা দিয়েছে। আফ্রিকার একসময়ের যুদ্ধকবলিত দেশ সিয়েরা লিওন একটি বড় প্রমাণ আমাদের সেনাদের পেশাগত উৎকর্ষতা-দক্ষতার ও মানবিক আচরণের। সিয়েরা লিওনের মানুষ আমাদের সেনাদের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়েছে যে এখন তাদের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হচ্ছে বাংলা। সেখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই প্রাঞ্জল বাংলা বলতে পারে। আমরা পরাশক্তি নই, কিন্তু সাধারণ মানের সামরিক শক্তির দেশ হয়েও জাতিসংঘের শান্তিমিশনের দায়িত্ব পালনকে কাজে লাগিয়ে অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনের বাইরেও তাদের এই ভূমিকা ও সাফল্য এককথায় বলা যায় নজিরবিহীন। আমরা স্যালুট জানাই আমাদের এমন গোৗরবময় সশস্ত্র বাহিনীকে।  

কে না জানে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে যেসব দেশের সশস্ত্র বাহিনী সম্মুখে থেকেছে তেমনি সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীও অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে থেকেছে, জেগে আছে। স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে রক্ষা করে যাওয়ার অনন্ত লড়াইয়ের লড়াকু সেনাদের সশস্র বাহিনী দিবসে আবারো টুপিখোলা সালাম! আপনারা এমনি অবিরাম ভালবাসতে থাকুন বাংলাদেশেকে, সমগ্র বিশ্বকে- শান্তিপ্রিয় সমগ্র মানবজাতিকে। আপনাদের অস্ত্র, মেধ, শ্রম সবসময় ব্যবহৃত হোক শান্তি প্রতিষ্ঠঅর স্বার্থে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Wordbridge School