• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৫ মার্চ, ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭
সেবা দিতে অপেক্ষায় থাকে ডিএমপির দশ টিম

পুলিশের ‘মানি এসকর্টে’ সাড়া নেই ব্যবসায়ীদের


বিশেষ প্রতিনিধি জানুয়ারি ২৩, ২০২১, ০৬:২০ পিএম
পুলিশের ‘মানি এসকর্টে’ সাড়া নেই ব্যবসায়ীদের

ঢাকা : এক সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ঈদের সময় ব্যাংক থেকে টাকা আনা-নেওয়ার জন্য গ্রাহকদের সহায়তা ‘মানি এসকর্ট’ সুবিধা নেওয়ার কথা বলত। পরে ১০টি মানি এসকর্ট টিমও গঠন করা হয়। এই টিমের সদস্যরা প্রতিদিন মানি এসকর্টের জন্য অপেক্ষা করলেও ব্যবসায়ীরা এই সুবিধা নিতে আগ্রহী নন। কারণ অনেক ব্যবসায়ী এটা ঝামেলা বা পুলিশের নানা প্রশ্নের সন্মুখীন হতে পারেন এমন আশঙ্কা করেন।

তবে পুলিশ বলছে, এ ধরনের সহায়তা দিতে তারা সবসময় প্রস্তুত। টাকা আনা-নেওয়া বা মানি এসকর্টের সময় ব্যবসায়ীদের পুলিশের কোনো প্রশ্নের সন্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনাই নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঢাকা শহরে বড় অংকের টাকা আনা-নেওয়ার পথে ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয়। এসব ঘটনা রোধে বিনা খরচে পুলিশ নিরাপত্তা দিতে চাইলেও তাতে সাড়া মিলছে না। 

তারপরও সাধারণ ব্যবসায়ী, ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিজেরাই মোটা অংকের টাকা বহন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বিপদের মুখোমুখী হচ্ছে। এমনকী টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় আহত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘটছে খুনের ঘটনা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিদিনই জনসাধারণের ‘মানি এসকর্টের’ জন্য ১০টি দল গঠন করা হয়। 

এরমধ্যে রমনা, মতিঝিল, ওয়ারি ও লালবাগ বিভাগে সেবা প্রত্যাশী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে মানি এসকর্ট সহায়তা দিতে আব্দুল গণি রোডের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে পাঁচটি টিম এবং মিরপুর, গুলশান, উত্তরা ও তেজগাঁও বিভাগে এ সেবা দিতে মিরপুর পুলিশ কন্ট্রোল রুমে পাঁচটি টিম সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রাখা হয়।

সেবা প্রত্যাশীদের ৯৫৫৯৯৩৩, ৯৫৫১১৮৮, ৯৫১৪৪০০ ও ০১৭১৩-৩৯৮৩১১ নম্বরে ফোন করতে বলা হয়েছে। স্থানীয় থানা এবং ডিএমপি সেন্ট্রাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার থেকে পুলিশ এসকর্ট সেবাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে প্রচারণাও চালানো হয়। কিন্তু তাতেও সাড়া মিলছে না।

গত বছর ১৭ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতির একটি পোস্ট অফিস থেকে গ্রাহকদের সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরের ৫০ লাখ টাকা তুলে নিজ গন্তব্য একটি সাব পোস্ট অফিসে যাওয়ার পথে একজনকে গুলি করে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তারপরও গ্রাহকদের টনক নড়েনি। 

মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কেউ ‘মানি এসকর্ট’ নিতে আগ্রহ দেখান না। নিজেরাই লাখ লাখ টাকা এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে এবং এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বহন করছেন। সেই ফাঁকে ঘটছে এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা।

রাজধানীর কোতয়ালী থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, বাদামতলী, ইসলামপুর ও বাবুবাজারে অসংখ্য ব্যবসায়ী রয়েছেন, কিন্তু নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া কেউ পুলিশের মানি এসকর্ট সেবা নেয় না। 

বংশাল থানার ওসি শাহীন ফকির বলেন, প্রতিদিন সকালে এসে তার থানা এলাকায় যত ব্যাংক রয়েছে সেসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। পুলিশের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে জানানোর অনুরোধ করেন।

তিনি জানান, ‘এলাকার ব্যবসায়ীদেরও বলা হয়, কিন্তু এসকর্ট নিয়ে তেমন সাড়া পাচ্ছি না। মাসে বড়জোর চার থেকে পাঁচজন মানি এসকর্ট নেয়। অথচ এলাকায় বহু ব্যবসায়ী টাকা বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায় বা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকে যায়।’

ভাষানটেক থানার ওসি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ঈদের সময় কিছু মানি এসকর্ট দেওয়া হয়, কিন্তু অন্যান্য সময় তেমন সাড়া নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, পুলিশ সব সময় জনগণের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত। টাকা বহনের ক্ষেত্রে তো সঙ্গে সঙ্গে টিম পাঠানো হয়। কিন্তু তারপরেও মানুষ টাকা এসকর্ট নিতে চায় না।

আর ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, কোটি টাকা বহনের প্রশ্ন এলে মানুষ পুলিশের সহযোগিতা নেয়। লাখ লাখ টাকার ক্ষেত্রে তারা এ বিষয়ে চিন্তা করে না। সাধারণত পোশাক কারখানার মালিকদের অনেকে মোটা অংকের টাকা বহনের ক্ষেত্রে পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে থাকে।

জানা যায়, মানুষ পুলিশের নিরাপত্তা সেবা নিতে অনীহা দেখালেও ছিনতাই, টাকা লোপাটসহ দুর্ঘটনা বন্ধ নেই।  গত ২৮ অক্টোবর ঢাকার সাভারে দিনের বেলায় এক ইতালি প্রবাসীকে গুলি করে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা। 

গত বছরের ১০ মে পুরান ঢাকার বিভিন্ন শাখা থেকে উত্তোলন করা ন্যাশনাল ব্যাংকের ৮০ লাখ টাকার একটি বস্তা গাড়ি থেকে খোঁয়া যায়। 

দিনে দুপুরে ঘটে যাওয়া ওই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা করে ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। পরে কয়েক দিনের মধ্যে ৬০ লাখ টাকা উদ্ধার এবং বিদেশি অস্ত্রসহ ওই টাকা লুটে নেওয়া চারজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

ওই বছর একই দিন দুপুরে যাত্রবাড়ীর জনপদ মোড়ে ৫৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া সাইফুল ইসলাম সবুজ (৩৫) ও রফিকুল ইসলাম মুকুল (৩০) যাত্রাবাড়ীর কাজলায় তাদের ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট অফিস চালাতেন। 

দুই ভাই একটি মোটরসাইকেল করে ব্যাংকের ৫৫ লাখ টাকা নিয়ে মতিঝিলে ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায় জমা দেওয়ার জন্য যাচ্ছিলেন। তাদের মোটরসাইকেলটি জনপদ মোড়ে এলে সেখানে তিন মোটরসাইকেলে ছয়জন ছিনতাইকারী তাদের গতিরোধ এবং মোটরসাইকেল ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পরে তাদের রড দিয়ে পিটিয়ে ৫৫ লাখ টাকার ব্যাগ নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় ফাঁকা গুলি করে সন্ত্রাসীরা।

একই দিন খিলগাঁওয়ে দিনদুপুরে গুলি চালিয়ে ২০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। গোরান বাজারের একতা ডিপার্টমেন্ট স্টোরের কর্মচারী আব্দুস সালাম (৩০) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ২০ লাখ টাকা নিয়ে পার্শ্ববর্তী ঢাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার উদ্দেশে বের হন। পথে সন্ত্রাসীরা তার গতিরোধ করে পরপর চার রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। দুটি গুলি আব্দুস সালামের বাম পায়ে বিদ্ধ হয়। দুর্বৃত্তরা টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন সালামকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন।

এরপর গত বছর ৭ জুন গাজীপুরে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার পথে একটি পোশাক কারখানার ৮২ লাখ ১২ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। কয়েক বছর আগে পুরান ঢাকার বাবুবাজারে কুষ্টিয়ার এক চাল ব্যবসায়ীকে গুলি করে অর্ধ কোটি টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা, পরে ওই ব্যবসায়ী মারা যান।

এদিকে এত এত দুর্ঘটনার পরেও টাকা বহনের জন্য কেন পুলিশের নিরাপত্তা নেওয়া হয় না, সে বিষয়ে নিজেদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের তেল ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা পরিবহন করতে পুলিশের সহযোগিতা চাই না, নিজেই টাকা ব্যাংকে বা অন্যান্য দোকানে দিয়ে আসি। সহযোগিতা চাইলে পুলিশ বলবে, এত টাকা কোথায় পেলেন? নানা প্রশ্ন করবে তাই এ ঝামেলায় জড়াতে চাই না।

সাইফুলের মতো পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর কাপড় ব্যবসায়ী মামুনও একই কথা বলেন। গত বছর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে টাকা খোঁয়ানোর পর তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল পুলিশের সহযোগিতা নেননি কেন? 

জবাবে তিনি বলেছিলেন, প্রতিনিয়ত টাকা আসছে আর ব্যাংকে জমা দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং বার বার কী আর পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া যায়?

তবে চকবাজার থানার ওসি মওদুত হওলাদার বলেন, তার এলাকায় ৫৪টি ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকে প্রতিদিন শত কোটি টাকা লেনদেন হলেও টাকা পরিবহনে পুলিশের সহযোগিতা তেমন চাওয়া হয় না। যে কয়েকবার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে প্রতিবারই এসকর্ট দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কখনো টাকার উৎস বা অন্য কিছু জানতে চায় না। শুধু নিরাপত্তা দিয়ে থাকে, বলেন তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারের সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীদের সুবিধা ও দুর্ঘটনা এড়াতে মানি এসকর্ট সার্ভিস করা হয়েছে। পুলিশি সহায়তা নিলে টাকা পরিবহণের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু অনেক সময় ব্যবসায়ীরা তা করতে চান না। যার কারণে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হোন পাশাপাশি টাকাও খোঁয়ান।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যখন বড় টাকা ট্রান্সফার করবেন তখন পুলিশি সহায়তা নিলে নিরাপদে তার টাকা ট্রান্সফার হয়ে যায়। অনেকেও তা করেও থাকে। বিষয়টি ব্যবসায়ীরা পজেটিভ নিলে কোনো সমস্যা থাকে না। দুর্ঘটনা থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই