ফেনীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাথাচাড়া দিচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’

  • ফেনী প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ফেনী শহরে আতঙ্কের অন্যতম নাম ছিল ‘কিশোর গ্যাং’। গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়া কিশোর ও তরুণরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, নারী উত্ত্যক্ত, এমনকি খুনোখুনিতেও জড়িয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর হঠাৎ করেই অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও গত কয়েক মাস ধরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে এসব গ্যাং। তাদের তৎপরতায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ফেনী মডেল থানায় কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট অন্তত আটটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩০ থেকে ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি দেড়শ থেকে দুইশ কিশোর-যুবককে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা শহরে নামে-বেনামে অন্তত ৩২টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য নিয়ে কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, ছোট ভাই–বড় ভাইয়ের দ্বন্দ্ব কিংবা মেয়েসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। এসব বিরোধ থেকে ধীরে ধীরে ‘রাজনৈতিক বড় ভাইদের’ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠে। চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি শহরের পাঠানবাড়ী এলাকায় এমনই একটি সংঘর্ষ হয়, যা পরে থানায় মামলা পর্যন্ত গড়ায়।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী শহরে ৭ থেকে ৮টি শক্তিশালী কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এগুলো আবার বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত। সক্রিয় এমন ৩২টি গ্যাংয়ের তালিকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এফবিএক্স-৩০, এমডিবি-১৯৬৪, এফসিবি-৭, এসআরডিএক্স, পিএক্স-১০, এমকেবি এক্স-১১, এফএক্স-১১, থ্রি আর ডিএক্স, এমবিডি-১৭৮, ডিকেবি, টক্সিন, সাইকো এক্সটেন, এসআরএক্স-২০, এফসিবি-২.০, এমডিবি-১৭৬, বিএসকেবি, জিকেবি-২৭, এসডিবি-২৬, এসিএক্স, রেডএক্স, এফসি সেভেন স্টার, আরকেবিএক্স-১১, এমএসবি, এইচপিজি, জেএসকেবি, এসএস-১০, এমসিকেএক্স-২০, টিআরবি-১৪৪ ও ১৪৩ এবং এমডিবি-৩৬০ উল্লেখযোগ্য।

এসব গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে নাদিম, রায়হান, বিজয়, নোমান, নাফিজ বৃত্ত, ঠিকানা বাবু, নিলয়, ফাহিম, নাফিস মুন্সি, আরিফুল ইসলাম বাবু, হামিম, তানভীর, আবির, মাসুম, তাসিন, রাকিব, রাজু, পিয়ান্ত, পাবেল, পিয়ম, জাওয়াদ, তাহমিদ, এলেক্স জাহিদ, সাইদুল, রনি, সাইমুন, ইশতিয়াক, আব্দুর রহমান, অভি খান, সাব্বির ও জুয়েলের নাম উঠে এসেছে।

এলাকাভিত্তিকভাবে দেখা গেছে, রেলস্টেশন, রাজাঝির দিঘি ও পাইলট এলাকায় রায়হান, মিজান রোডে জুয়েল ও নিলয়, ফেনী পাইলট ও মিজান রোডে আবির, মিজান রোড ও আলিয়া মাঠ এলাকায় মাসুম, ফেনী আলিয়া ও মিজান রোডে তানভীর, শান্তি নিকেতন স্কুলসংলগ্ন গলি ও রিকশাগ্যারেজের পাশের মাঠে হামিম, মুক্তবাজার ও ডাক্তারপাড়ায় তাসিন, ওয়াপদা মাঠ ও পাঠানবাড়িতে রাজু, ফেনী সেন্টারের সামনে ও আশপাশে সাইমুন ও ইশতিয়াক, একাডেমি এলাকার ফারুক হোটেল ও বনানী এলাকায় আরিফুল ইসলাম বাবু, মমিন জাহান মসজিদ ও আড্ডা বাড়ি এলাকায় নাফিস মুন্সি, একই এলাকায় সাব্বির, পাঠানবাড়িতে অভি খান, ফালাহিয়া মাদ্রাসা এলাকায় পিয়ান্ত, ডাক্তারপাড়া ও মুক্তবাজারে আব্দুর রহমান এবং একাডেমি এলাকায় বিজয় ও এলেক্স জাহিদের অনুসারীরা নিয়মিত আড্ডা দেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, একসময় কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে। তবে বর্তমানে সেই চিত্র বদলেছে। এখন ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ছয় থেকে সাতজন নেতার নাম এসব গ্যাংয়ের পেছনে আলোচনায় রয়েছে। উকিলপাড়া, পেট্টোবাংলা, দাউদপুল, সহদেবপুর, নাজির রোড ও মিজান রোড এলাকায় ছাত্রদলের এক নেতা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জোবায়ের হোসেন শরীফ ও শাফায়েত রহিত এসব এলাকার বেশির ভাগ গ্যাং দেখভাল করেন বলে জানা গেছে।

রেলগেট থেকে একাডেমি, বনানীপাড়া, ফারুক হোটেল ও সদর হাসপাতাল পর্যন্ত এলাকার গ্যাংগুলো জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক আরিফুল ইসলাম সুমনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় উল্লেখ আছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আহাদুল ইসলাম তনিক এসব গ্রুপের নেতৃত্ব দেন। বিজয়সিংহ দিঘি ও মহিপাল এলাকায় বড় কোনো গ্যাং না থাকলেও ছোট কয়েকটি গ্রুপ শ্রমিক দল নেতা স্বপনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পৌর যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবু তালেব ভূঁইয়া ফলেশ্বর এলাকায় একটি গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করেন। পাঠানবাড়ী, ডাক্তারপাড়া, শান্তি কোম্পানি রোড ও ফালাহিয়া মাদ্রাসা এলাকায় গ্যাংগুলোর পেছনে জেলা ছাত্রদলের নেতা সাফায়াত হোসেন নাদিমের নাম পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া রামপুর, পুরোনো পুলিশ কোয়ার্টার, শাহীন একাডেমি, সদর হাসপাতাল মোড়, বারাহীপুর ও বিরিঞ্চি এলাকাতেও ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতার নাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় রয়েছে। ফেনী সরকারি কলেজ ও পৌর ছাত্রদলের শীর্ষ দুই নেতার নামও বিভিন্ন গ্রুপ ও উপগ্রুপ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত হিসেবে উঠে এসেছে।

ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নিশাত তাবাসসুম প্রথম আলোকে বলেন, কিশোর গ্যাং নির্মূলে পুলিশ কাজ করছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে ছবি সংগ্রহ করে পরিবারের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। মামলা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও সচেতন মহলের তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এসএইচ