বরিশাল: সমুদ্রের ঢেউ আজও আগের মতোই আছড়ে পড়ে তীরে, নদীর স্রোতও থেমে নেই। কিন্তু থেমে গেছে সেই মানুষগুলোর জীবন, যাদের প্রতিদিনের লড়াই ছিল এই জলরাশির সঙ্গে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য খাতে। ডিজেলের তীব্র সংকটে পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর,বরিশালসহ উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে সাগর ও নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। এতে কয়েক লাখ জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার, পাইকার, শ্রমিকসহ সকলেই চরম সংকটে পড়েছেন।
ট্রলারমালিক ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, দেশে সামগ্রিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও স্থানীয়ভাবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাড়তি লাভের আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ফলে বরগুনার পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর আলীপুর-মহিপুর, ভোলার লালমোহন-মনপুরাসহ বিভিন্ন মৎস্য বন্দর ও অবতরণ কেন্দ্রে শত শত ট্রলার নোঙর করে আছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের দক্ষিণাঞ্চলের ছয় জেলায় প্রায় ৩ লাখ ১১ হাজার সমুদ্রগামী জেলে রয়েছেন। ডিজেলের অভাবে তাদের বড় অংশই এখন কর্মহীন। ফলে উপকূলজুড়ে জেলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
জেলেদের দাবি, ডিজেল সংকটে মাছ আহরণ ৭০- ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এতে মৎস্যবন্দর, মোকাম ও আড়তগুলোতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। লাখো মানুষের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এরই মধ্যে এপ্রিলের মাঝামাঝি শুরু হচ্ছে ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। জ্বালানি সংকটের পর এই নিষেধাজ্ঞা জেলেদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। জেলেরা দ্রুত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করা, কৃত্রিম সংকট বন্ধ এবং তেলের ওপর প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার পায়রা নদীসংলগ্ন বড়বিঘাই, ছোটবিঘাই, ইটবাড়িয়া, বদরপুর ও মাদারবুনিয়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, জেলেরা নৌকা ঘাটে বেঁধে অলস সময় কাটাচ্ছেন। একই চিত্র দুমকি,গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, বাউফল ও কলাপাড়া উপজেলাতেও। মাছ ধরার পরিবর্তে কেউ কৃষিকাজ করছেন, কেউ গবাদিপশু চরাচ্ছেন।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সংকট চললেও গত ৩-৪ দিনে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। আগে দূর-দূরান্তে গিয়ে তেল সংগ্রহ করা গেলেও এখন ফিলিং স্টেশনগুলোতেও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের জেলে মো. বাবুল হাওলাদার (৫৫) বলেন, নদীভাঙনে সব চইল্লা গ্যাছে। এই মাছ ধরেই সংসার চলে। তেল কিনতে গিয়াই মরণ। ১২০ টাকার তেল আনতে ২০০ টাকা ভাড়া লাগে। তাও দুইবার খেও দিয়া শেষ। চার দিন ধইরা নদীতে যাইতে পারি নাই।
জেলে মো. জাকির কাজী (৪২) বলেন, তেল না থাকলে নৌকা চলে না। মাছ ধরা বন্ধ। এখন খুব কষ্টে দিন কাটতেছে। নৌকা মেরামত করে রেখেছি, কিন্তু তেল না পাওয়ায় নামাতে পারছি না। কোথাও তেল পাই না মাছও আগের মতো নাই।
প্রবীণ জেলে আবুল কালাম (৬৫) বলেন, স্ত্রীর ওষুধ কিনতে পারি না। মাছ ধরতে না পারলে সংসার চলবে কেমনে। পটুয়াখালী শহরের শিয়ালী বাজার, টোলপ্লাজা, পল্লী বিদ্যুৎ এলাকা ও বসাকবাজারের পায়রা ফিলিং স্টেশনসহ অন্তত পাঁচটি পাম্পে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন শেষ হয়ে গেছে। সব তেল শেষ, রোববার থেকে সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে।
বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য বন্দরে গিয়ে দেখা গেছে, শত শত ট্রলার সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে আছে। জেলেরা কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ বসে আছেন দুশ্চিন্তায়। এক জেলে আবদুল মালেক বলেন, তিন দিন ধরে বসে আছি। ট্রলার প্রস্তুত, কিন্তু ডিজেল নেই। বাজারে তেল আছে, কিন্তু খোলাখুলি বিক্রি করে না। বেশি দাম দিলে গোপনে দেয়।
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি চৌধুরী গোলাম মোস্তফা বলেন, কিছু ব্যবসায়ী তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এতে জেলেরা তেল পাচ্ছে না। প্রতি সপ্তাহে ২-২.৫ লাখ লিটার ডিজেল দরকার, কিন্তু এখন মাত্র ৫ হাজার লিটার সরবরাহ হচ্ছে।
একই চিত্র ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, যেখানে প্রতিদিন শত শত ট্রলার ভিড় করত, সেখানে এখন অচলাবস্থা। জেলেরা ঘাটে বসেই দিন কাটাচ্ছেন। ট্রলার মালিক ছলাউদ্দিন বলেন, এক সপ্তাহে ১,২০০ লিটার তেল লাগে। ৩০০ লিটার নিয়ে গিয়ে দুই দিনেই ফিরে আসতে হয়েছে। সরবরাহ একদম কম। অন্তত চার হাজার জেলে পরিবার বেকার।
এ বিষয়ে বরিশাল মৎস্য দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কামরুল ইসলাম বলেন, সরকারের নিয়ম অনুযায়ী জেলেদের জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। তবে যদি কেউ তেল মজুত করে, স্থানীয় প্রশাসনকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিবন্ধিত জেলেদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য আরও কী সুবিধা দেওয়া যায়, তা নিয়ে মৎস্য বিভাগ সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
পিএস