তেল ও শ্রমিক সংকটের পর ধানে এবার বৃষ্টির হানা

  • ময়মনসিংহ প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
ছবি : প্রতিনিধি

ময়মনসিংহ: ভালো নেই ধান উৎপাদনে দেশের শীর্ষ জেলা ময়মনসিংহের কৃষকরা। একদিকে ধান কাটার মেশিনে জ্বালানি সংকট অন্যদিকে রয়েছে শ্রমিক সংকট। এর মধ্যে মরার উপর খাঁড়ার ঘা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে বিলসহ নিচু জায়গার ধানের জমি। সময়মত ধান কাটতে না পারলে বাকি ফসল ঘরে তোলা নিয়ে থেকে যাচ্ছে শঙ্কা। জলাশয়ে অবৈধ বাঁধ অপসারণ, জ্বালানি তেল ও ধান কাটার মেশিন সহজলভ্যের দাবি কৃষকদের।
  
পাকা ধানের সোনালি ঢেউ, সকালের রোদে দুলছে কৃষকের বছরের পরিশ্রমের ফসল। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের মাঝেও স্বস্তি নেই ময়মনসিংহের কৃষকদের মনে। জ্বালানি ও শ্রমিক সংকট, অস্বাভাবিক মজুরি বৃদ্ধি এবং কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের অভাবে ধান ঘরে তোলা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

ধান কাটার ভরা মৌসুমেও দিগুন মজুরি দিয়েও মিলছে না শ্রমিক। ১ বিঘা ধান কাটতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩২০০ টাকা, আর মাড়াইয়ে বাড়তি গুনতে হচ্ছে আরও ৭০০ টাকা। কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করলে খরচ কমত প্রায় ১৭০০ টাকা। কিন্তু এখানেও রয়েছে জ্বালানি সংকট। এত সংকটেও কয়েকদিনের ভারী বর্ষণেও নষ্ট হচ্ছে ফসল।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় ধান কাটতে থাকা কৃষক রাসেল মিয়া বলেন, কয়েকদিন রৌদ ছিল বেশি। সেই সময় ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাইনি। এখন কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। এখনও শ্রমিক পাচ্ছি না। এদিকে বাতাসে ধান গাছগুলো হেলে পড়েছে। মাটিতে নষ্ট হচ্ছে ধান। তাই শ্রমিক না পেয়ে নিজের জমির ধান নিজেরাই কাটছি।

কৃষক মতিউর রহমান জানান, হারভেস্টার মেশিন পাওয়া যাচ্ছে না। ভাড়া আনতে গেলে বলে তেল নাই। এর কারণে সময়মত ধান কাটতে পারিনি। এখন বৃষ্টিতে ধানগুলো তলিয়ে গেছে। এক দুইদিনের মধ্যে ধান কাটতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। ঘরে তখন কোন ফসলই তুলতে পারব না।

ভালুকা উপজেলার কৃষক আওলাদ রুবেল জানান, বোরো আবাদ শুরু থেকেই একটার পর একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সার কীটনাশক পেতে সমস্যা হয়েছে এবার। এখন সমস্যা ধান কাটা নিয়ে। শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে যে টাকা খরচ হবে ধান বিক্রির পর লাভের মুখ দেখতে পারব না।

এদিকে কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধানের জমি। নদীতে অবৈধ বাঁধ দেওয়ায় বৃষ্টির পানি জলাশয়গুলো না যেতে পেরে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা।  আর এই জলাবদ্ধতার কারণে তলিয়ে গেছে ধানের জমি। জেলার গৌরীপুর উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়নের সুরিয়া নদীতে অবৈধ বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানি।  খাল গুলোও আছে দখলের কারণে ভরাট হয়ে। বৃষ্টির পানি না সরে যাওয়ায় কৃষকরা পানিতে নেমে বাঁচাতে মরিয়া অবশিষ্ট ফসল।

গৌরীপুর উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়নের কৃষক মাহাবুব আলম জানান, নদী দখলে, খাল দখলে। বৃষ্টির পানি নামবে কোথা থেকে। সরকার খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে শুনলাম। কিন্তু এখানে যদি নদীর অবৈধ বাঁধ অপসারণ আর খাল পুন:খনন করা না হয় তাহলে আগামীতে ধান আবাদ করা মুশকিল হয়ে যাবে। 

কৃষক ওমর ফারুক জানান, ধারদেনা করে এবার অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ধান আবাদ করেছি। কৃষি অফিসারদের পরামর্শে ফলনও বেশ ভালো হয়েছিলো। কিন্তু ধান কাটার সময় হয়ে গেলেও মেশিনের অভাবে কাটতে পারিনি। মেশিন ভাড়া আনতে গেলে বলছে তেল নাই। এদিকে একজন ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। বাড়তি টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না শ্রমিক।  এতে ধান কাটতে দেরি হওয়ায় শুরু হলো বৃষ্টি। এখন ফসলের জমি পানিতে। যতটুকু পারছি নিজেরাই ধান কেটে তুলছি। 

গৌরীপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমা জানান, অচিন্তপুর ইউনিয়নের সুরিয়া নদীতে অবৈধ ভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় আমরা পাঁচটি জায়গা অপসারণ করেছি। এখন সেখানে আশপাশের জমিতে পানি জমা নেই। যে কৃষকরা অভিযোগ করেছিলো তারা জানিয়েছে পানি নেমে গেছে।  এছাড়াও আরো যে বিল আছে সেগুলোতে যদি কৃত্রিম বাঁধ দেওয়া থাকে তাহলে তা অপসারণ করবে প্রশাসন। যারা নদী খাল বিল অবৈধ ভাবে দখলের চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত)  ড. উম্মে হাবিবা জানান, এবছর জেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ২ লক্ষ ৬৩ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লক্ষ ৪২ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন। এখন পর্যন্ত জেলায় ১১% ধান কর্তন করা হয়েছে। ধান আবাদের শুরু থেকে কৃষকদেরকে সময়মত সার বীজ দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদেরকে সমসময় পরামর্শ দিয়ে গেছে। যার কারণে এবার ভালো ফসল পাওয়া গিয়েছে। আমাদের ধান কাটার মেশিন গুলো নিজ নিজ এলাকায় আছে। প্রথমে জ্বালাণি সংকট থাকলেও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগের কারণে কৃষির উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তবে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে ধান কাটার জন্য শ্রমিক সংকট রয়েছে। শ্রমিকদের এই সংকটও দূর হবে। কয়েকদিনের বৃষ্টি৷ পাতে ১৭ হেক্টর জমির ধান আংশিক ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমান বেশি না। ৮০ % ধান পেকে গেলে তা কর্তন করার জন্য কৃষকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিএস