ঈশ্বরদী: অবশেষে ঢাকা-পাবনা আন্তঃনগর ট্রেন ঈশ্বরদী জংশন হয়ে যাওয়ার দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পালা শেষ হতে চলেছে ঈশ্বরদীবাসীর। পাবনা-ঢাকা সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন সার্ভিস চালুর প্রস্তুতি এখন শেষপর্যায়ে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম জানান, পাবনা থেকে ঢাকায় সরাসরি যাতায়াতের জন্য নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী নভেম্বরের শেষার্ধে ট্রেনটি চালুর আশা করা হচ্ছে। যাত্রাপথে ট্রেনটি ঈশ্বরদী জংশন স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে।
ঢাকা-পাবনা রুটে ট্রেন চালুর প্রস্তুতি সম্পর্কে সচিব বলেন, পাবনার মানুষের কাছে এ ট্রেনের বিশেষ আবেগের জায়গা রয়েছে। এরই মধ্যে ভারত থেকে আনা ১৮টি কোচ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কোচগুলো বর্তমানে সৈয়দপুর ক্যারেজ ওয়ার্কশপে রয়েছে। কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এরপর ভারতীয় প্রকৌশলীরা এসে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করবেন। সব প্রস্তুতি শেষ হলে নভেম্বরের শেষার্ধে ঢাকা-পাবনা-ঢাকা রুটে ১২টি কোচ নিয়ে ট্রেনটি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ট্রেনটির ঈশ্বরদী স্টেশনে যাত্রাবিরতির বিষয়ে ফাহিমুল ইসলাম বলেন, মাঝগ্রাম থেকে ইঞ্জিন ঘুরিয়ে ট্রেন ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিচালনাগত কিছু ঝুঁকি রয়েছে। ঈশ্বরদী জংশনে ইঞ্জিন পরিবর্তনসহ ট্রেন পরিচালনার প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকায় সেখান থেকেই এ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে যাত্রায় কিছুটা অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। তবে নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত সুবিধার কথা বিবেচনা করে ঈশ্বরদী হয়ে ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর সাড়ে তিন বছর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ঘোষণা অনুযায়ী পাবনা- ঢাকা- পাবনা ট্রেন চালুর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সত্ত্বেও অজ্ঞাত কারণে চালু হয়নি।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, নতুন এই আন্তঃনগর ট্রেন ঈশ্বরদী হয়েই আগামী ২০ নভেম্বর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এ ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হবে ১০ নভেম্বর।
যমুনা সেতু হয়ে চলাচলকারী এ ট্রেন চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এবং পাবনা জেলা বিএনপির আহবায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয় থেকে ২৫ অক্টোবর জারি করা এক পত্রে, নতুন ট্রেনের নাম, সময়সূচি ও যাত্রাবিরতির সংশোধিত প্রস্তাব মহাপরিচালকের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ট্রেন দুটির নাম রাখা হয়েছে ‘পাবনা প্রভাতী এক্সপ্রেস (৮০৮)’ ও ‘পাবনা গোধূলি এক্সপ্রেস (৮০৭)’। ৮০৮ নম্বর ট্রেনটি পাবনা থেকে সকাল ৮টায় ছেড়ে ঈশ্বরদী হয়ে দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর প্রস্তাব করা হয়েছে এবং ৮০৭ নম্বর ট্রেনটি ঢাকা থেকে বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে ছেড়ে রাত ৯টা ২০ মিনিটে পাবনায় পৌঁছবে।
প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী, ট্রেন দুটি টেবুনিয়া, দাশুড়িয়া, ঈশ্বরদী, মাঝগ্রাম, চাটমোহর, বড়ালব্রিজ, উল্লাপাড়া, শহীদ মনসুর আলী, টাঙ্গাইল, জয়দেবপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে।
রেলওয়ের পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন ট্রেনের সময়সূচি বাস্তবায়নে ৭৭৯ নম্বর ঢালারচর এক্সপ্রেসের ছাড়ার সময় সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে এগিয়ে সকাল ৬টা ১০ মিনিট করতে হবে। এ ছাড়া ৭৬৩ নম্বর ট্রেনের সময়সূচিও আংশিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ইপিজেড, বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ঈশ্বরদী। অন্যদিকে দেশের অত্যন্ত পুরোনো ও ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ পাবনা জেলা। জেলাবাসীর সাথে ঈশ্বরদীবাসিরও ঈশ্বরদী হয়ে সরাসরি পাবনা-ঢাকা রেল চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে ঈশ্বরদী-পাবনা-নগরবাড়ি রেললাইনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে তা থেমে যায়। এরপর বিগত সরকারের আমলে রাজশাহী-ঢালারচর পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালু করা হলেও পাবনা-ঢাকা সরাসরি রেল সার্ভিস চালু হয়নি।
২০২৩ সালের ১৬ মে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পাবনায় দেওয়া বিশাল সংবর্ধনা সভায় তিনি ঘোষণা করেন, ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে পাবনা-ঢাকা সরাসরি রেল চলবে। এরপরই সাবেক রাষ্ট্রপতির ঘোষণা বাস্তবায়নে রেল কর্তৃপক্ষ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। এরপর অজ্ঞাত কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি।
এরপর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও পাবনা জেলা বিএনপির আহবায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব ট্রেনটি চালুর বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এক্ষেত্রে পাবনার সন্তান রেল সচিব ফাহিমুল ইসলামও ভূমিকা রাখেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
এদিকে ঈশ্বরদীবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পাবনা-ঢাকা সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচলের দাবি পূরণ হচ্ছে—এমন খবরে আনন্দিত ও উল্লসিত ঈশ্বরদীর সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
তারা বলেন, নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু হলে ঈশ্বরদী,আটঘরিয়া, পাবনা, লালপুর, বাগাতিপাড়া, বড়াইগ্রাম, ভেড়ামারাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার যাত্রীদের ঢাকায় যাতায়াত আরও সহজ হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াতকারী এ অঞ্চলের মানুষ এর সুফল পাবেন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো বেগবান হবে বলেই তারা আশা করা করছেন।
পিএস