দুবাই বিমানবন্দর নয়, বরং নিজের বাসার কাছের একটি শপিং মল থেকে আটক হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমদ। গত ১২ জুন দুবাই পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। বেনজীর আহমদের পরিবারের দাবি, তার এক সংসদ সদস্য (এমপি) বন্ধু ও ব্যবসায়িক সহযোগী কৌশলে তাকে শপিং মলে ডেকে নিয়ে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন।
আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুবাইয়ের আদালতে তাকে হাজির করা হতে পারে। একই দিনে তার জামিনের আবেদন করার প্রস্তুতিও নিয়েছে পরিবার।
যেভাবে ফাঁদে পড়লেন বেনজীর: পরিবারের চাঞ্চল্যকর দাবি
পারিবারিক সূত্রের তথ্যমতে, বেনজীর আহমদ দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে দুবাইয়ে অবস্থান করছিলেন। গত ১২ জুন তিনি বাসায় থাকাকালীন চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন সংসদ সদস্য—যিনি বেনজীরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচিত—তাকে একটি শপিং মলে দেখা করার জন্য ফোন করেন।
পরিবারের অভিযোগ, ওই এমপি আগে থেকেই দুবাই পুলিশকে তথ্য দিয়ে রেখেছিলেন। বেনজীর আহমদ নির্দিষ্ট শপিং মলে পৌঁছানো মাত্রই সেখানে ওত পেতে থাকা দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলে ওই সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেছে পরিবার।
পরিবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
"দুবাইয়ে স্থানীয়ভাবে বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। বাংলাদেশ পুলিশের অনুরোধে ইন্টারপোলের জারি করা রেড নোটিশের নথি ওই সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুবাই পুলিশের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং তাকে আটক করিয়েছেন।" (তবে এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি)।
যার বিরুদ্ধে বেনজীর আহমদকে কৌশলে ধরিয়ে দেওয়ার এই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সেই সংসদ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রথমে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যোগাযোগ করা সম্ভব হলেও, তিনি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান।
দুবাইয়ে সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি থাকার কারণে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ ছিল। আজ মঙ্গলবার থেকে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বেনজীর আহমদকে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।
বেনজীর আহমদের পক্ষে লড়তে ইতিমধ্যে দুবাইয়ের একজন স্থানীয় আইনজীবী নিয়োগ করেছে তার পরিবার। আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী ঢাকা ও ইন্টারপোলে চলমান মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতিমধ্যেই দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছে। আজ আদালতে তাকে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করা হলে, তার আইনজীবী তাৎক্ষণিকভাবে জামিন চাইবেন। অন্যথায় প্রসিকিউশন দপ্তরে প্রয়োজনীয় আইনি আবেদন জমা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে বেনজীর আহমদ বর্তমানে দুবাই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতেই দুবাই পুলিশ বিষয়টি ঢাকার ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)-কে অবহিত করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের আটকের খবর আমরা পেয়েছি। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকলেও বেনজীর আহমদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না বলে মনে করছেন আইন ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। একজন সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি জানান, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
১. দুই দেশের বিদ্যমান আইন ও পারস্পরিক অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি।
২. মামলার ধরন এবং দুবাই আদালতের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
৩. নথিপত্র যাচাইয়ের পর দুবাই কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টি।
দুবাই পুলিশ বর্তমানে বেনজীরের ভিসার বৈধতা, সেখানে অবস্থানের উদ্দেশ্য এবং বাংলাদেশের পাঠানো অভিযোগগুলো প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করছে।
উল্লেখ্য, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে দেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ একাধিক দুর্নীতি ও জালিয়াতির মামলা এবং অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। দুবাইয়ের আদালতের আজকের সিদ্ধান্তের পরেই স্পষ্ট হবে তার পরবর্তী গন্তব্য—জামিন নাকি বাংলাদেশের কারাগার।
এম