ডেনিম রপ্তানিতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের

  • আবদুল হাকিম  | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ১, ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
ফাইল ছবি

ঢাকা: প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে পেছনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডেনিম পণ্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশ রেকর্ড সাফল্য অর্জন করেছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের তুলনায় ২০২৫ সালে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্জন করে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীনে থাকা দ্য অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি ২০২৫ সালে ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৯৫৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৭১২ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার।  ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশ থেকে ৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারের ডেনিম আমদানি করে, যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের এই ডেনিম বাজারে ২৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে শীর্ষ রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

বিদায়ী বছরে অস্থির বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ সময়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পোশাকপণ্য রপ্তানি করে ৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, যা ২০২৪ সালের ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।

[268296]

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। রপ্তানি ৩৪ দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালে শূন্য দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৯৭ শতাংশে, যা প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক বেশি।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মেক্সিকোর রপ্তানি ২ দশমিক ১৮ শতাংশ কমে শূন্য দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল শূন্য দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। দেশটির বাজার অংশীদারত্ব ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তৃতীয় অবস্থানে ভিয়েতনাম ২৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে শূন্য দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। দেশটির বাজার অংশীদারত্ব ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ হলেও, প্রবৃদ্ধি ও অংশীদারত্ব—দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

চতুর্থ অবস্থানে পাকিস্তানের রপ্তানি ১৬ দশমিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে শূন্য দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল শূন্য দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে দেশটি মাঝারি প্রবৃদ্ধি দেখালেও বাংলাদেশ থেকে অনেকটাই পিছিয়ে।

এর পরে রয়েছে কম্বোডিয়া ২২ দশমিক ০৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল শূন্য দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে এটি এখনও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক ছোট অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে, চীনের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ৫১ দশমিক ২২ শতাংশ কমে শূন্য দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল শূন্য দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। দেশটির বাজার অংশীদারত্ব কমে ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করেছে।

মিশরের রপ্তানি ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে শূন্য দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল শূন্য দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে দেশটি দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

ছোট রপ্তানিকারকদের মধ্যে ভারত ৬১ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে শূন্য দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ইন্দোনেশিয়া সর্বোচ্চ ৬৮ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে শূন্য দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে তাদের বাজার অংশীদারত্ব যথাক্রমে ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ ও ১ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় খুবই কম।

রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্লেষক ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন।

প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও উৎপাদন সক্ষমতা: বাংলাদেশ বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করতে সক্ষম এবং তুলনামূলক কম খরচে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বড় অর্ডার দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন পুনর্বিন্যাস: চীননির্ভরতা কমাতে, চায়না প্লাস ওয়ান কৌশল গ্রহণ করছে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো। এই পরিবর্তনের বড় সুবিধাভোগী হয়েছে বাংলাদেশ। ফলে অনেক বিদেশি ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে বেশি পণ্য কিনেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ গ্রিন গার্মেন্টস কারখানার একটি বড় অংশ অবস্থিত। ফল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর পরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালা পালনে এবং তাদের চাহিদা পূরণ সহজ হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সবুজ কারখানা বা গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ‘লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন’ (লিড) সনদ রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ২৮০টি সবুজ কারখানা রয়েছে, যা দেশের পোশাকশিল্পে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রাকে আরও সুদৃঢ় করেছে। এর মধ্যে ১১৮টি প্লাটিনাম এবং ১৪৩টি গোল্ড রেটিং অর্জন করেছে। পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত লিড কারখানার মধ্যে বাংলাদেশেরই ৫২টি কারখানা স্থান করে নিয়েছে,যা এই খাতের টেকসই উৎপাদনে অগ্রগতির স্পষ্ট প্রমাণ।

বাংলাদেশে ডেনিম খাতে বিশেষ দক্ষতা: গত কয়েক বছর বাংলাদেশের ডেনিম উৎপাদনকারীরা প্রযুক্তি এবং গবেষণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ফলে, ডেনিম উৎপাদন, ওয়াশিং, ফিনিশিং এবং ডিজাইন উন্নয়নে বাংলাদেশের কারখানাগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়িয়েছে।

আমদানি উৎসে পরিবর্তন: চীনের ডেনিম রপ্তানিতে ৫১ শতাংশের বেশি পতন বড় সুযোগ তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশ কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে। বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক ডেনিম সোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, প্রতিযোগিতামূলক এবং স্কেলযোগ্য কেন্দ্রগুলোর একটি। মূল্য প্রতিযোগিতা, সময়মতো সরবরাহ এবং কমপ্লায়েন্স নিশ্চয়তার কারণে ক্রেতারা ক্রমেই বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন।

ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সোনালীনিউজকে বলেন, ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি কৌশলগত বিনিয়োগ এবং প্রায় ৫০টি আধুনিক মিল স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ডেনিম খাত তৈরি পোশাকশিল্পে বৈচিত্র্য এবং উদ্ভাবনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

এএইচ/এসআই