বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: চিকিৎসায় বড় ঘাটতি, বাড়ছে অকালমৃত্যু

  • নিউজ ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১০:১৫ এএম

দেশে হৃদরোগের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দেড় কোটির বেশি মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত বলে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। প্রতিবছর দেশে যত মানুষ মারা যান, তাদের প্রায় তিনজনের একজনের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। শুধু বয়স্কদের মধ্যেই নয়, তরুণদের মধ্যেও উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ হৃদরোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবার সুযোগ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

হৃদরোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি উচ্চরক্তচাপ। দেশে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নার চালু করা হলেও সেখানেও দেখা দিয়েছে ওষুধ সংকট। বিভিন্ন উপজেলায় এনসিডি কর্নারে মজুত ওষুধ এক থেকে দুই মাসের বেশি চালানোর মতো নয়। কোথাও কোথাও রোগীদের এক মাসের পরিবর্তে ১০ দিনের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এতে নিয়মিত ওষুধনির্ভর দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আজ বিশ্ব হৃদরোগ দিবস। প্রতিবছর ২৯ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রচারে বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের বার্তা-‘হার্ট ডিজিজ ক্যান হাইড ইন প্লেইন সাইট : ডোন্ট মিস এ বিট’। হৃদরোগের লক্ষণ অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়, এ বিষয়টি সামনে এনে দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব হৃদরোগ দিবস উপলক্ষ্যে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) সোমবার ‘তরুণদের উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বাজেট : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক ওয়েবিনারের আয়োজন করে। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহায়তায় দেওয়া হয়। ওয়েবিনারে জানানো হয়, উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি হৃদরোগের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বে প্রতিবছর হৃদরোগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকাল মৃত্যুবরণ করেন। দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশ হৃদরোগের কারণে ঘটে। ২০২৪ সালে হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চরক্তচাপ। ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে-২০১৮’-এর তথ্যানুযায়ী, দেশে ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত। ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই ভবিষ্যৎ হৃদরোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। বর্ধিত বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চরক্তচাপের ওষুধে ব্যয় করা হলে দেশে উচ্চরক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

উপজেলা পর্যায়ে ওষুধের সংকট

উপজেলা পর্যায়ে এ রোগের নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভ) ডা. শামিম যোবায়ের যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে হাসপাতালগুলোর ওষুধ কেনার জন্য এমএসআর (মেডিকেল সার্জিক্যাল রিকুইজিশন) ফান্ড ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। এমএসআর ফান্ডের পরিমাণ খুবই কম। এই অর্থ দিয়ে ইনডোর রোগীদের চিকিৎসাসহ উপজেলার অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা চালাতে হয়। এনসিডি কর্নারের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দরিদ্র রোগীদের বড় অংশ সমস্যায় পড়বেন।

চিকিৎসা এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক

হৃদরোগের চিকিৎসাসেবার বড় অংশ এখনো রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে আইসিইউ বেড রয়েছে প্রায় তিন হাজার, যার বেশির ভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক। হৃদরোগের চিকিৎসা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হলে বিভাগীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চাপ : জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিসংখ্যানেও হৃদরোগের চিকিৎসায় রোগীদের চাপের চিত্র পাওয়া যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯০ জন এবং বহির্বিভাগে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৪৪ জন। এ সময়ে ভর্তি হয়েছেন ৮১ হাজার ৮৪১ জন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫ হাজার ৫৫২ জন।

প্রতিরোধেই কমবে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের চিকিৎসায় হাসপাতাল ও আইসিইউ বাড়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধূমপান বর্জন, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা জরুরি।

এম