৩০০ বছরের ‘যন্তর মন্তর’ যেভাবে দিল্লির প্রতিবাদের মঞ্চ হলো

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:১৯ এএম

১৭২৪ সালে নির্মিত ভারতের রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক ‘যন্তর মন্তর’ সম্প্রতি পার করেছে তার ৩০০ বছর। তবে তিন শতাব্দীর প্রাচীন এই জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দিরটি আজ আর কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; আধুনিক ভারতের বুকে এটি হয়ে উঠেছে অধিকার আদায়ের প্রধান মঞ্চ। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যেকোনো গণবিক্ষোভ বা প্রতিবাদের কথা উঠলেই সবার আগে নাম আসে এই চত্বরের।

বর্তমানে ভারতের বেকার যুবকদের অধিকার ও ‘নিট’ পরীক্ষার জালিয়াতির বিরুদ্ধে চলা এক নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু এই যন্তর মন্তর। বিখ্যাত সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক থেকে শুরু করে হাজারো শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী এখানে অবস্থান ও অনশন কর্মসূচি পালন করছেন।

বোট ক্লাব থেকে যন্তর মন্তর: যেভাবে বদলাল প্রতিবাদের ঠিকানা

অথচ ইতিহাস বলছে, নব্বইয়ের দশকের আগে দিল্লির প্রধান প্রতিবাদী মঞ্চ ছিল ‘বোট ক্লাব’। ১৯৮৮ সালে বোট ক্লাব লনে প্রায় ৫ লাখ কৃষকের এক ঐতিহাসিক মহাজমায়েত পুরো রাজধানী অচল করে দিয়েছিল। এরপর থেকেই নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে বড় ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে।

পরবর্তীতে, ১৯৯৩ সালে সংসদ ভবনের আশেপাশের এলাকায় সব ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করে প্রশাসন। নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা এবং শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে তখন বিকল্প হিসেবে ‘যন্তর মন্তর রোড’কে প্রতিবাদের কেন্দ্রীয় স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

কৌশলগত অবস্থান ও আইনি স্বীকৃতি

ভৌগোলিক দিক থেকে যন্তর মন্তর দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হলেও, এটি সংসদ ভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে কিছুটা দূরত্বে অবস্থিত। ফলে এখানে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভ চললেও ভিভিআইপি জোনের নিরাপত্তা বা যান চলাচলে সরাসরি বড় কোনো বিঘ্ন ঘটে না। ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও এক ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, যন্তর মন্তরে আইন মেনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও কর্মসূচি করা দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অংশ।

আলোচনায় নতুন রাজনৈতিক শক্তি: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

চলতি বছরের মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে বেকার যুবকদের পরোক্ষভাবে ‘তেলাপোকা’ (ককরোচ) ও সমাজের পরজীবী বলে মন্তব্য করেন। এই চরম অপমানের প্রতিবাদে গত ১৬ মে রাজনৈতিক কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে সম্পূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক ও প্রতীকী রূপ দিয়ে গঠন করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। খুব দ্রুতই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে এই দল এবং ইনস্টাগ্রাম সহ বিভিন্ন মাধ্যমে এর অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

গত ২০ জুলাই (সোমবার) সিজেপির ডাকে প্রায় ২০ হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থী সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রার চেষ্টা করলে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় মধ্য দিল্লি। যন্তর মন্তর ও কনট প্লেস এলাকায় পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

বর্তমান পরিস্থিতি

পুলিশের নজিরবিহীন বলপ্রয়োগের পর আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, তারা আপাতত নতুন কোনো সড়ক পদযাত্রা করবেন না। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত দিল্লির যন্তর মন্তরে তাদের অনির্দিষ্টকালের অবস্থান ধর্মঘট ও শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। শত বাধা ও কোলাহলের মাঝেও প্রশাসনের কাছে নিজেদের দাবি পৌঁছে দিতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন দেশটির তরুণ সমাজ।

এম