বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ‘বাইনান্স’-এ ঘটেছে ক্রিপ্টো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা। মাত্র ২০ মিনিটের ঝোড়ো অভিযানে হ্যাকাররা হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৬৩০ কোটি (৬.৩ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের ডিজিটাল সম্পদ। ঘটনার আকস্মিকতা ও বিপুল অঙ্কের চুরির খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো বাজারে তীব্র প্যানিক বা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি ও ব্লকচেইন রেকর্ড বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাইনান্সের যেসব ওয়ালেট ব্যবহার করে গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনা করা হতো, মূলত সেগুলোকে লক্ষ্য করেই হামলাটি চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় বাইনান্স কর্তৃপক্ষ প্রথমে জানিয়েছিল, তাদের কোনো কর্মকর্তার একটি ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। তবে পরবর্তী তদন্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও একাধিক পয়েন্টে গলদ ও অনুপ্রবেশের প্রমাণ মেলে।
ঠিক কীভাবে এত বড় ঘটনা ঘটল—তার ব্যাখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্লকচেইন অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান ‘টিআরএম ল্যাবস’ ও হংকংয়ের প্রখ্যাত আইনজীবী জোশুয়া চু জানান, হ্যাকাররা মূলত বাইনান্সের লেনদেন অনুমোদনকারী ‘সাইনিং ইনফোস্ট্রাকচার’ বা অনুমোদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল। অর্থাৎ, চোর সরাসরি ভল্টের চাবি চুরি করেনি, বরং ভল্টকে টাকা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদানকারী পুরো ডিজিটাল ব্যবস্থাটিকেই নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় রাত আটটার দিকে শুরু হওয়া এই তাণ্ডব চলে মাত্র ২০ মিনিট, আর তাতেই খালি হয়ে যায় বাইনান্সের প্রধান প্রধান ওয়ালেট।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বাইনান্সের সহ-প্রধান নির্বাহী (কো-সিইও) রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে তাদের প্রতিষ্ঠানে ১ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের একটি বিটকয়েন রিজার্ভ বা 'সিকিউর এসেট ফান্ড' রয়েছে। এই ফান্ড ও কোম্পানির নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করে সব ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের অর্থ এখন কোথায় বা কার কাছে আছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উত্তেজনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুরি যাওয়া অর্থের প্রায় অর্ধেকই ছিল বিভিন্ন ‘স্টেবলকয়েন’ (যেমন- ইউএসডিটি, ইউএসডিসি)। এসব মুদ্রার একটি বিশেষ ফিচার হলো, এর ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে দূর থেকেই তা অকার্যকর বা ফ্রিজ করে দিতে পারে। ঘটনার পরপরই টেথার, সার্কেল, রিপল এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের ক্রিপ্টো ভেঞ্চার ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তড়িঘড়ি করে প্রায় অর্ধেক অর্থ ফ্রিজ করে দেয়। ফলে হ্যাকাররা সেগুলোকে আর ক্যাশ বা নগদে রূপান্তর করতে পারছে না।
তবে বাকি প্রায় ২৪০ কোটি ডলার সমমূল্যের বিটকয়েন ও ইথার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কারণ কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ না থাকায় এগুলো চাইলেই ফ্রিজ করা সম্ভব নয়। ফলে অর্থ অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে হ্যাকাররা অভিনব স্বয়ংক্রিয় কৌশল ও ওয়ালেট পরিবর্তন পদ্ধতি ব্যবহার করে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
কে বা কারা এই হামলার পেছনে রয়েছে, তা নিয়ে এখনও বাইনান্স আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট কারও নাম না বললেও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠানের ইঙ্গিত উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের দিকে। টিআরএম ল্যাবসের দাবি, গত বছর ‘বাইবিট’ নামে আরেকটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে উত্তর কোরীয় হ্যাকাররা যেভাবে হামলা চালিয়েছিল, বাইনান্সের হামলার ধরণও হুবহু এক। তবে উত্তর কোরিয়া সবসময়ই এ ধরনের সাইবার হামলা বা ক্রিপ্টো চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
গত বছরজুড়ে বিশ্বজুড়ে ছোট-বড় ১৫০টি সাইবার হামলায় প্রায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরি হয়েছিল। কিন্তু বাইনান্সের মতো এত বড় ও সুরক্ষিত প্ল্যাটফর্মে মাত্র এক হামলায় ৬৩০ কোটি ডলার উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় পুরো ডিজিটাল কারেন্সি বাজার বড় ধরনের ঝাঁকুনি খেয়েছে। শুক্রবারে বড় বড় ক্রিপ্টোকারেন্সির দরপতনের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরাও বাজার থেকে তড়িঘড়ি নিজেদের অর্থ তুলে নিতে শুরু করেছেন। সূত্র: রয়টার্স
এম