যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রবর্ত্তী নির্বাচনের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন না আসলেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দশকের পর দশক ধরে চলা ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ক্ষমতাসীন দলের এই পরাজয় ট্রাম্পের একচ্ছত্র ক্ষমতার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই রকম রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও, যা দুই প্রভাবশালী নেতার ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিচ্ছে।
কয়েকদিনের ব্যবধানে হওয়া দুই দেশের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রভাবশালী নেতাদের ক্ষমতার শেষের শুরু কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে তাঁদের রাজনৈতিক পতন অবশ্যম্ভাবী এখনই বলা না গেলেও, এটা স্পষ্ট যে তাঁরা এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে ক্ষমতা ধরে রাখার চেয়ে ক্ষমতার শর্তগুলো নিজেদের পক্ষে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল কংগ্রেসে তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর মেয়াদ এখনই শেষ হচ্ছে না।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফল সরাসরি সরকার গঠনের প্রশ্ন তুলেছে, কারণ তাঁর দল লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সমর্থন তাদের নেই।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের বিপরীতে তারা জিতেছে ২২৫টিতে এবং উচ্চকক্ষ সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৫১ আসন অতিক্রম করে ৫৪টিতে নিশ্চিতভাবে জয় পেয়েছে।
ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। দ্বিতীয় মেয়াদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠার বার্তা দিলেও যুদ্ধ ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা সেই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে এই নির্বাচন ট্রাম্পের নেতৃত্বের ওপর একটি গণভোটে পরিণত হয়।
ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর সংকটের ধরন ভিন্ন। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তাঁর দল লিকুদ পার্টি নেসেটের ১২০ আসনের মধ্যে এককভাবে ২৭টি পেলেও জোটের শরিকদের আসন মিলিয়ে তা দাঁড়ায় ৫৩টিতে, যা সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। বিরোধীরা ৪৮ আসন পেলেও ১৯ আসন পাওয়া আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়ায় সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল গ্রহণ করে সম্ভাবনাময় জোটের নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন।
গাদি আইজেনকোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি থাকায় বিরোধীদের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়ের প্রতিক্রিয়াতেই শেষের আবেগের বার্তা রয়েছে। ট্রাম্প যেখানে লিংকর মেমোরিয়ালের সংস্কার ও ওয়াশিংটনকে সুন্দর করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন, যা অবসরের প্রস্তুতির বার্তা দেয়; তেমনি নেতানিয়াহু নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় জয় চুরি হয়ে গেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন।
এই পালাবদলের পর ট্রাম্পের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। ডেমোক্র্যাটরা তদন্ত কমিটি গঠন, শুনানি ও তলবের ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখতে পারবে, যা বাজেট, ঋণসীমা, শুল্কনীতি ও যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
তবে ট্রাম্প দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন যে তিনি ফল মেনে নিতে প্রস্তুত এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে আপত্তি নেই। এদিকে নেতানিয়াহুকে বিরোধী জোটের সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বিরোধী জোট ৪২ দিনের মধ্যে আস্থা ভোটে ব্যর্থ হলে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন নেতানিয়াহু, যেখানে তাঁর ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে।
এই দুই দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্পের নির্বাচনী ধাক্কা তাঁকে ইরান নীতিতে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য করবে এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ব্যয় বাড়াবে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু সরকার গঠন করতে না পারলে ইসরায়েলের নতুন নেতৃত্ব গাজা, ইরান, লেবানন ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে সংযমের কৌশল নিতে পারে।
ট্রাম্প ইসরায়েলকে বছরে দেওয়া ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা ২০২৭ সাল থেকে বন্ধ হওয়ার ঘোষণা দিলেও অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত বা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য ও ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার ইঙ্গিত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি আনতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এসএইচ