জিন্নাহর ঢাকা সফর ও বাঙালি চেতনার উদয়

  • সোনালী ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
ফাইল ছবি

১৯৪৮ সালের ১৯শে মার্চ। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার মাত্র সাত মাসের মাথায় প্রথমবার ঢাকায় এসেছিলেন তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। যক্ষ্মাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকা এই নেতার পূর্ব পাকিস্তানে এটাই ছিল প্রথম ও শেষ সফর। এই সফরের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু সেই দশ দিনের সফর ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির গতিপথ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

জিন্নাহর আগমনকে কেন্দ্র করে মুসলিম লীগ সরকার ঢাকায় অভাবনীয় উদ্দীপনা ও প্রস্তুতির আয়োজন করেছিল। তোরণ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, বিশেষ ট্রেন-স্টিমারের ব্যবস্থা এবং রেসকোর্স ময়দানে সুবিশাল মঞ্চ তৈরির মাধ্যমে পুরো শহরকে উৎসবের নগরীতে রূপ দেওয়া হয়েছিল। 

এমনকি ১৯শে মার্চ বিকেলে প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে জমায়েত হয়েছিলেন তাঁকে দেখতে। সে সময়ের তরুণ ছাত্রনেতা তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি কিংবা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি গভীর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, গভর্নর জেনারেল হিসেবে তিনি হয়তো রাজনৈতিক দল বা সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিতর্কিত রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষাকে প্রাধান্য দেবেন।

তবে সেই প্রত্যাশা দ্রুতই এক গভীর হতাশায় পরিণত হয়। সফরকালে ঢাকা সেনানিবাসে সামরিক সদস্যদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়া থেকে শুরু করে রেসকোর্স ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহর দেওয়া বক্তব্য ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে চরম ক্ষুব্ধ করে তোলে। রেসকোর্স ময়দান ও কার্জন হলের সমাবর্তনে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবলই উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে তিনি রাষ্ট্রের ঐক্য বিনষ্টকারী এবং বিদেশি চক্রান্তের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তৎক্ষণাৎ "না, না" ধ্বনি তুলে তাঁর বক্তব্যের জোর প্রতিবাদ জানান।

এই সফর চলাকালে জিন্নাহর সঙ্গে ছাত্রনেতা ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। চিফ সেক্রেটারির বাসভবনে তৎকালীন ছাত্রনেতাদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ঘটে এবং সুইজারল্যান্ড ও কানাডার মতো বহুভাষিক রাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করা হয়।

ঐতিহাসিক তথ্য ও নথিপত্র অনুযায়ী, সেই বৈঠকে গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে তুমুল তর্কাতর্কি থেকে শুরু করে তাঁকে অপসারণের আবেদনের হুঁশিয়ারি পর্যন্ত উচ্চারণ করেছিলেন ছাত্রনেতারা। ফলে রাজনৈতিক উর্ধ্বে ওঠার যে আস্থা মানুষ তাঁর ওপর রেখেছিল, তা চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয় এবং কায়েদে আজমের বিপুল জনপ্রিয়তা মুহূর্তেই ভাটা পড়ে।

ঢাকার পর চট্টগ্রাম সফর করে পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম বন্দর এবং পুলিশ লাইনসে সমাবেশ শেষ করে ২৮শে মার্চ রেডিও পাকিস্তানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেন জিন্নাহ। বিদায়ী বেতার ভাষণেও তিনি ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ‘উচ্ছৃঙ্খলতা’ এবং ‘প্রাদেশিকতার বিষ’ ছড়ানোর বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তবে সচেতন বাঙালি সমাজ কিংবা তৎকালীন ক্ষুব্ধ তরুণ শিক্ষার্থীরা তাঁর সেই রক্তচক্ষু বা রাজনৈতিক চাপ মেনে নেননি।

জিন্নাহর সেই দশ দিনের কঠোর অবস্থান এবং ভুল রাজনৈতিক মূল্যায়ন মূলত বাঙালি জাতিকে নিজেদের স্বাধিকার ও ভাষা রক্ষার লড়াইয়ে আরও একতাবদ্ধ হতে বাধ্য করেছিল। যার চরম পরিণতি হিসেবে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাজপথে তাজা রক্ত ঝরেছিল এবং অবশেষে ১৯৫৪ সালে বাধ্য হয়ে পাকিস্তান গণপরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৪৭-এর মোড়কে অর্জিত স্বাধীনতা যে বাঙালির আসল মুক্তি ছিল না, ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের সেই দশ দিনেই তার চূড়ান্ত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়ে যায়।

এসএইচ