২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক প্রতীকের সাদৃশ্যপূর্ণ ছবি ও নির্দিষ্ট প্রতীকের আধিক্য নিয়ে শিক্ষা অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি এবং প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে নৌকার ছবির প্রাচুর্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের বড় একটি অংশ মনে করছে, নদীমাতৃক দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটাতে নৌকার ব্যবহার স্বাভাবিক হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এসব ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম শ্রেণির আমার বাংলা বইয়ে অন্তত ৩৪টি, দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ২৩টি এবং তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ২৪ থেকে ২৫টি নৌকার ছবি রাখা হয়েছে। এমনকি দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি বইয়ের বিভিন্ন পাতায়ও নৌকার ছবির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
প্রথম শ্রেণির ছই, বৈঠা, আষাঢ় কিংবা বৃষ্টি ও দেশ পরিচিতিমূলক পাঠের পাশাপাশি তৃতীয় শ্রেণির আমাদের গ্রাম, নদীর দেশ ও তালগাছ কবিতার মতো বিষয়বস্তুতেও এই ছবিগুলোর ব্যবহার রয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকার নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে এবং শুধু ছবির সংখ্যা না দেখে পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্য কতটুকু, সেটাই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত।
তবে এই বিতর্কের চেয়েও বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের একটি নির্দিষ্ট চিত্র। বইটির উপাত্ত ও তথ্য অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তর বা প্রজ্ঞা বোঝানোর জন্য দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু এই দাঁড়িপাল্লা রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধিত নির্বাচনী প্রতীক, সে কারণে বিষয়টি মুহূর্তেই রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে।
বিগত শিক্ষাবর্ষগুলোর বই পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সংস্করণেও এই প্রতীকটি ছিল। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের সংস্করণে উইজডম শব্দের বাংলা বুদ্ধি ব্যবহার করে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করা হলেও, ২০২৭ সালের বইয়ে এসে রহস্যজনকভাবে আবার প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা ফিরিয়ে আনা হয়।
বইটির সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও এনসিটিবি কর্মকর্তা মু. আব্দুল্লাহ আল যোবায়েরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রাফিকস বা নকশা তৈরির দায়িত্বে থাকা শিল্পীরা আন্তর্জাতিক বা প্রচলিত জ্ঞানের পিরামিডের স্বীকৃত চিত্র অনুসরণ করেই এই দাঁড়িপাল্লার ছবি যুক্ত করেছিলেন। এখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা পক্ষপাতিত্ব ছিল না বলে দাবি করা হলেও, রাজনৈতিক দলের প্রতীকের সঙ্গে এর সরাসরি মিল থাকায় সমালোচনা থামেনি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বাড়তি বিতর্ক এড়াতে শেষ পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে এনসিটিবি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের মুদ্রণ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে যেসব বই চলে গেছে তা ফেরত এনে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দাঁড়িপাল্লার ছবির পরিবর্তে সেখানে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এই সংশোধিত বইগুলো মাঠপর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, প্রাথমিকের বইগুলোতে থাকা নৌকার আধিক্য বা ছবিগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।
এসএইচ