সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর সরকার গঠনের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে বিএনপি। মঙ্গলবার নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দলটির নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। দলীয় ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃত্বের অধীনে প্রথম মন্ত্রিসভা হতে পারে মাঝারি আকারের, যেখানে সদস্য সংখ্যা ৪০-এর কাছাকাছি থাকতে পারে।
শপথ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া
সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করা হবে। সেই নেতা রাষ্ট্রপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আস্থা অর্জনের বিষয়টি জানালে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী ও নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কেমন হতে পারে মন্ত্রিসভার কাঠামো
বর্তমানে সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা ৪৩টি। তবে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পূর্বে নির্বাচিত সরকারের জন্য সর্বোচ্চ ২৩ জন মন্ত্রী ও ১২ জন প্রতিমন্ত্রী রাখার সুপারিশ করেছিল এবং মন্ত্রণালয় সংখ্যা কমিয়ে ২৫-এ নামানোর প্রস্তাব দেয়। যদিও দলীয় সূত্র বলছে, প্রথম ধাপে ৪০ থেকে ৪২ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর শপথের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
দলের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভায় নবীন ও প্রবীণ নেতৃত্বের সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। জোটের শরিক দলের কয়েকজন নেতা এবং একাধিক টেকনোক্র্যাট সদস্যও থাকতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
আগের সরকারের তুলনায়
দ্বাদশ সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ ৩৭ জন সদস্য ছিলেন। এর আগে ২০১৮ সালে গঠিত সরকারে সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৭। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা শুরু হয়েছিল ৪৯ সদস্য নিয়ে, যা পরে বেড়ে ৫৩-এ দাঁড়ায়। আর ২০০৯ সালে নবম সংসদের পর গঠিত মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ৬২ সদস্যে পৌঁছায়।
২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকারে মোট ৬০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী ছিলেন। সেই তুলনায় এবার তুলনামূলকভাবে সংযত আকারের মন্ত্রিসভা গঠনের ইঙ্গিত মিলছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্ত্রিসভার আকার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা জরুরি। বড় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন পূর্ণমন্ত্রী এবং ছোট মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রীর অধীনে থাকলে প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় থাকে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সীমিত আকারের মন্ত্রিসভা গঠন করলে ব্যয় সাশ্রয় ও কার্যকারিতা—দুই-ই নিশ্চিত করা সম্ভব।
আলোচনায় যেসব নাম
দলের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। জোটসঙ্গী কয়েকটি দলের নেতাদের নামও শোনা যাচ্ছে। তবে দায়িত্বশীল কোনো সূত্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা নিশ্চিত করেনি।
কূটনৈতিক আমন্ত্রণ
শপথ অনুষ্ঠানে ভারত, চীন, পাকিস্তানসহ ১৩টি দেশের সরকারপ্রধান বা প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন।
সংসদ ও স্মৃতিসৌধে প্রস্তুতি
নবনির্বাচিত সদস্যদের স্বাগত জানাতে জাতীয় সংসদ ভবনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার কাজ চলছে। দক্ষিণ প্লাজায় শপথের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। শপথের পর প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এ উপলক্ষে স্মৃতিসৌধ এলাকায় সাময়িকভাবে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা কেমন আকার ও বিন্যাস পায়—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে। এখন নজর মঙ্গলবারের শপথ অনুষ্ঠানের দিকে।
এম