বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জুলাই সনদ, গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং তার বাস্তবায়ন কাঠামোর বৈধতা নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের হাইকোর্ট যে রুল জারি করেছে, তা কেবল একটি আইনি প্রশ্ন নয়-এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আত্মপরিচয়, ক্ষমতার সীমা এবং গণতান্ত্রিক ন্যায্যতার মৌলিক ভিত্তিকে সামনে এনে দিয়েছে।
বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ প্রশ্ন তুলেছেন-একটি অন্তর্বর্তী সরকার কি সংসদ, গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কারের মতো গভীর রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখে? বিশেষ করে “হ্যাঁ/না” ভিত্তিক গণভোট, ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবের তফসিল এবং সংবিধান সংস্কার সংস্থার সদস্য হিসেবে এমপিদের অতিরিক্ত শপথ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আদালতের নজরে গুরুতর সাংবিধানিক উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে।
এই মামলায় আইন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিসভা বিভাগ, সংসদ সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়সহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো হয়েছে। দুটি জনস্বার্থ রিটে মূলত প্রশ্ন তোলা হয়েছে-২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে কি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে হেটেছে?
আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির যুগপৎ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ১৭ বছর পর ক্ষমতায় ফেরে, আর গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোট “সমর্থন” জানালেও সেই সমর্থনের আইনি অর্থ ও পরিধি রয়ে গেছে খুবই অস্পষ্ট। গণভোটের প্রশ্নগুলোতে ৪৭টি প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র ১৯–২০টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাকি সংস্কারগুলো আইনি ও রাজনৈতিক অচলাবস্থায় পড়ে।
এ প্রক্রিয়াকে আরও বিতর্কিত করেছে রাষ্ট্রপতির এক বিলম্বিত আদেশ, যা জুলাই সনদকে হঠাৎ করে গণভোট কাঠামোয় রূপান্তর করে এবং নির্বাচিত এমপিদের “সংবিধান সংস্কার পরিষদ” হিসেবে পুনর্গঠন করে। এই পদক্ষেপ সংসদীয় সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না-সেই প্রশ্ন এখন আদালতের বিবেচনায়।
গণভোটের নকশা ও প্রচারণাও সমালোচনার বাইরে নয়। একক “হ্যাঁ/না” ব্যালটে চারটি ভিন্ন প্রশ্নকে একত্রে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য করা হয়, যা ভোটারদের অবহিত সম্মতিকে খর্ব করেছে। উপরন্তু, অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে সক্রিয় প্রচারণা চালিয়ে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন টাকা ব্যয় করেছে—যা নিরপেক্ষ প্রশাসন ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের সীমারেখাকে ঝাপসা করে দেয়। জাতীয়তাবাদী স্লোগানে ভর করা বার্তায় সংস্কারের বাস্তব ব্যাখ্যা অনুপস্থিত ছিল, ফলে ভোটাদের তথ্য ঘাটতি প্রকট হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই সনদ ও গণভোটে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার, মানবতাবিরোধী অপরাধ, জুলাই হত্যাকাণ্ডের জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের প্রশ্নগুলো প্রায় উপেক্ষিত থেকেছে, অথচ এগুলোই ছিল অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি।
এই প্রেক্ষাপটে “প্রয়োজনীয়তার মতবাদ”কে সামনে এনে অনেক সিদ্ধান্তকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। আইনি তত্ত্ব হিসেবে প্রয়োজনীয়তা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে স্বীকৃত হলেও এর কাঠামোগত দুর্বলতা ভয়াবহ। “আসন্ন ক্ষতি”, “কোন বিকল্প নেই” বা “আনুপাতিকতা”—এই ধারণাগুলো ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ক্ষমতাসীনদের হাতে এটি সহজেই অপব্যবহারের হাতিয়ারে পরিণত হয়। শাসন ও প্রশাসনে প্রয়োজনীয়তার পুনঃপুনঃ প্রয়োগ ব্যতিক্রমকে নিয়মে পরিণত করে, সংসদীয় জবাবদিহিতা ক্ষুণ্ন করে এবং আইনের শাসনের ভিত্তিকে দুর্বল করে।
বিচারিক ক্ষেত্রেও এই মতবাদের বিস্তার বিপজ্জনক। “কোন বিকল্প নেই” যুক্তিতে পক্ষপাতদুষ্ট বা অযোগ্য ফোরামকে বৈধতা দেওয়া হলে ন্যায়বিচারের প্রতি জনআস্থা ভেঙে পড়ে। ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনে প্রয়োজনীয়তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি করে, বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি অবৈধতার স্বাভাবিকীকরণ ঘটায়-আইন নীতির নয়, ক্ষমতার অনুগত হয়ে ওঠে।
জুলাই সনদ ও গণভোট-নির্ভর সংস্কার প্রক্রিয়া স্পষ্ট ম্যান্ডেট ছাড়াই সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি করেছে, যা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংঘাতের বীজ বপন করছে। প্রয়োজনীয়তার মতবাদ এখানে সতর্ক সংকেত—এটি জরুরি মুহূর্তে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সাধারণীকরণ হলে আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক। বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কারের পথ সংসদে ফিরে আসা, উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক বিতর্ক এবং সুস্পষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই স্থিতিশীল হতে পারে। অন্তর্বর্তী কর্তৃত্ব দ্বারা পরিচালিত অস্পষ্ট গণভোট নয়-আইনের শাসন, জবাবদিহিতা ও জনআস্থাই পারে ভঙ্গুর রূপান্তরকে টেকসই ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে।
লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা, সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা
এসএইচ