বাংলা নববর্ষের ইতিকথা, স্বাগত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

  • সৈয়দ আমিরুজ্জামান  | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম
ফাইল ছবি

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।

তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক।

এসো এসো…

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো

যাক পুরাতন স্মৃতি

যাক ভুলে যাওয়া গীতি

যাক অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক

যাক যাক

এসো এসো…

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো

মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা,

অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা।

মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা,

অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা।

রসের আবেশ রাশি, শুষ্ক করি দাও আসি।

আনো আনো, আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।

আনো আনো, আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।

মায়ার কুঁজঝটি জাল যাক দূরে, যাক যাক যাক।

এসো এসো…

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো

তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক।

এসো এসো…

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো

-(এসো হে বৈশাখ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

মানব সভ্যতায় দিন, মাস, বর্ষ গণনার ইতিহাস সুপ্রাচীন। সভ্যতার অগ্রযাত্রার সাথে সাথে এই গণনা প্রক্রিয়ায়ও এসেছে ভিন্নতা।

মানুষ যখন আদিম যুগ থেকে কৃষি যুগে প্রবেশ করে, তখন তাকে ক্ষণ, দিন, তারিখের হিসেব রাখতে হয়েছে। কৃষি উৎপাদন আবহাওয়া নির্ভর, এর সাথে তা স্বল্প সময়ে উৎপাদন সম্ভবপর হয় না।

প্রথম যুগে বর্ষ গণনা হতো অলিখিতভাবে। জীবন-জীবিকার মৌলিক প্রয়োজনে মানুষ তৈরি করে নিয়েছিল তার মৌখিক বর্ষপঞ্জি। ক্রমান্বয়ে বর্ষ, মাস, সপ্তাহ, দিন, প্রহর ইত্যাদি সৃষ্টি হয়েছে জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী। বর্ষ গণনায় যে বারো মাসের নাম আছে তার অধিকাংশই নামাঙ্কিত করা হয়েছে নক্ষত্রের নামে। আর সপ্তাহের দিনগুলো নামাঙ্কিত হয়েছে গ্রহের নাম থেকে। চব্বিশ ঘণ্টাকে চারটি প্রহরে বিভাজিত করা হয়েছে। অগ্রসর এবং কৃষিজীবী সমাজ যাদের মধ্যে লেখার প্রচলন শুরু হয় তারাই বর্ষপঞ্জি তৈরি করে নিজেদের জীবন-জীবিকাকে সংঘবদ্ধ করেছে।

বাংলা বর্ষপঞ্জি

বাঙালি সমাজে কৃষি সভ্যতার সূচনাকাল থেকেই বাংলা সনের উদ্ভব – এমন মত প্রকাশ করেন ইতিহাসবিদ ও নৃতাত্ত্বিকরা। তাদের মতে, সমাজ বিকাশের ধারায় সেভাবেই বাংলা সনের সৃষ্টি হয়েছে। বাঙালি কৃষকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় রয়েছে বাংলা সন। কৃষি সভ্যতার পাশাপাশি নাগরিক সভ্যতায়ও বাংলা সন প্রভাব ফেলেছে। এমনকি জাতীয়তাবাদী প্রগতিশীল সংগ্রামের ধারায় বাঙালির বাংলা সন পথ দেখিয়েছে। খুঁজে এনে দিয়েছে বাঙালির নিজস্ব দেশ, রাষ্ট্র, ভাষা, সন, সংস্কৃতি।

বাঙালি জীবনের অসাম্প্রদায়িক, সার্বজনীন একটি উৎসব হল পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ। এদিনটি প্রতিটি বাঙালির জীবনে নিয়ে আসে উৎসব আমেজ আর ফুরফুরে বাতাসের দিন বসন্ত। আলপনা আঁকা শাড়ি আর পাঞ্জাবি ছাড়া যেন এদিনটিকে আর পালন করাই যায় না। সাথে লাল সবুজ আর সাদার মিশেলে হাতে, গালে ফুলকি আঁকা এখন হাল ফ্যাশন হয়ে দাড়িয়েছে। প্রতি বছরই ক্রমশ বাড়ছে বর্ষবরণের আমেজ। স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচার, রমনার বটমূল থেকে পুরো ঢাকা হয়ে প্রতিটি বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে গ্রামে পালন করা হয়। শুধু গ্রাম নয় শহর উপশহর রাজধানীর ঢাকারও বিভিন্ন অলিগলিতে বসে বৈশাখি মেলা। পান্তা- ইলিশ, বাঁশি, ঢাক -ঢোলের বাজনায় আর মঙ্গল শোভাযাত্রায় পূর্নতা পাচ্ছে বাঙালির এ উৎসব মুখরতা। এবার একটু ফিরে দেখা বাংলা নববর্ষের পথচলার ইতিহাস।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস :

সৌর পঞ্জিমতে, বাংলায় বারোটি মাস অনেক আগে থেকেই পালন হয়ে আসছে। কিন্তু গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় দেখা যায়, এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় এই সৌর বছর গণনা শুরু হত। ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, ভারত বর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য শুরুর পর থেকে আরবী বছর হিজরী পঞ্জিকা অনুযায়ী তারা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরী সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সাথে এর কোন মিল পাওয়া যেত না। আর তখনই সম্রাট আকবর এর সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বাংলায় বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহন করেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী সে সময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর বছর ও আরবী হিজরী সালের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরীর কাজ শুরু করেন। 

বাংলা বছর নির্ধারন নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ের প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ই মার্চ বা ১১ ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে পরীক্ষামূলক এই গণনা পদ্ধতিকে কার্যকর ধরা হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর তারিখ থেকে অর্থাৎ সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনের তারিখ থেকে। প্রথমে ফসলি সন বলা হলেও পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।

বাংলা মাসের নামকরণ :

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলা মাসের নামগুলো বিভিন্ন তারকারাজির নাম থেকে নেয়া হয়েছে। যেমনঃ বিশাখা থেকে বৈশাখ, জেষ্ঠ্যা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রইহনী থেকে অগ্রহায়ণ, পূষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুনি থেকে ফাল্গুণ এবং চিত্রা থেকে চৈত্র। আগেকার দিনে অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটা শুরু হত বলে এই মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা হত। তাই এ মাসের নামই রাখা হয় অগ্রহায়ণ। অগ্র অর্থ প্রথম আর হায়ন অর্থ বর্ষ বা ধান। সম্রাট আকবরের সময়ে একটি বিষয় ছিল অত্যন্ত কষ্ট সাধ্য, তা হল মাসের প্রত্যেকটি দিনের জন্য আলাদা আলাদা নাম ছিল। যা কিনা প্রজা সাধারণের মনে রাখা খুবই কষ্ট হত। তাই সম্রাট শাহজাহান ৭ দিনে সপ্তাহ ভিত্তিক বাংলায় দিনের নামকরণের কাজ শুরু করেন। ইংরেজী বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ইংরেজি ৭ দিনের নামের কিছুটা আদলে বাংলায় ৭ দিনের নামকরণ করা হয়। যেমন : সানডে- রবিবার। সান অর্থ রবি বা সূর্য আর ডে অর্থ দিন। এভাবে বর্ষ গণনার রীতিকে বাংলায় প্রবর্তনের সংস্কার শুরু হয় মোঘল আমলে।

বর্ষ বরণের প্রবর্তিত রূপ :

তখনকার দিনে শুধু কৃষিকাজ করার তাৎপর্যকে ধারণ করেই বাংলায় বছর গণনার রীতি চালু হয়। কিন্তু বহির্বিশ্বের সাথে বাঙালিদের যোগাযোগ নিরবিচ্ছিন্ন রাখার সুবিধার্থে বাংলাদেশের সব জায়গাতেই খ্রিষ্ট্রীয় সন ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ ই এপ্রিল নববর্ষ পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত পঞ্জিকা অনুসারে এ দিনটিকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বাংলা দিনপঞ্জির সাথে হিজরী ও খ্রিষ্ট্রীয় সনের মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। তা হলো হিজরী সাল চলে চাঁদের সাথে আর খ্রিষ্ট্রীয় সাল চলে ঘড়ির সাথে। একারণে হিজরী সনের নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনের মধ্য দিয়ে, ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে আর বাংলা সনের শুরু হয় ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথে।

নতুন বছর বরণে বাঙালি আয়োজন :

বাংলাদেশে বর্ষবরণের মূল আয়োজন মূলত ঢাকার রমনা পার্কের বটমূলকে (অনেকে বলেন অশ্মথ মূল) ঘিরেই। সেই আনন্দ আয়োজন আর পান্তা ইলিশের বাঙালিয়ানায় পুরো জাতি নিজেকে খুঁজে ফিরে ফেলে আসা গত দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন আর নতুন অনাগত সময়কে বরনের ব্যস্ততায়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি জাতিই নিজেদের ইতিহাস সংস্কৃতিকে বরনের জন্য বিশেষ বিশেষ দিনকে স্মরণীয় করে রাখে।

যেমন প্রাচীন আরবীয়রা ‘ওকাজের মেলা’, ইরানী’রা ‘নওরোজ উৎসব’ ও প্রাচীন ভারতীয়রা ‘দোলপূর্ণিমায়’ নববর্ষ উদযাপন করে থাকত। ( উল্লেখ্য, ইরানী’রা এখনো অনেক ঘটা করেই নওরোজ উৎসব পালন করে থাকে)। এখানে বলে রাখা ভাল, পাকিস্তান আমলে পূর্বপাকিস্তানে সব সময়ই বাঙালি সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করত। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারীর প্রতিবাদে ১৯৬৫ সাল ( ১৩৭৫ বঙ্গাব্দে) ছায়ানট নামের একটি সংগঠন রমনা পার্কে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উৎসব পালনের আয়োজন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এসো হে বৈশাখ …… এসো , এসো …. গানের মাধ্যমে তারা স্বাগত জানাতে শুরু করে নতুন বছরকে। বর্ষবরন এগিয়ে যায় আরো এক ধাপ। বিস্তৃত হতে শুরু করে ছায়ানট নামের সংগঠনটির। যা এখন বাংলাদেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি মহিরূহে পরিণত হয়েছে। ১৯৭২ সালের পর থেকে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ জাতীয় উৎসবের স্বীকৃতি পায়। ১৯৮০ সালে বৈশাখী মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে এক ধাপ বাড়তি ছোঁয়া পায় বাংলা নববর্ষ বরণের অনুষ্ঠান। ছড়িয়ে পড়ে সবার অন্তরে অন্তরে। প্রতি বছরই তাই কোটি কোটি বাঙালির অপেক্ষা থাকে কবে আসবে বাংলা নববর্ষ।

আধুনিকতার ছোয়ায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠান মালা :

বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কল্যাণে এখন ভোরে রমনা বটমূলে শুরু হওয়া বর্ষ বরণের অনুষ্ঠান উপভোগ করে কয়েক কোটি বাঙ্গালি। ছায়ানটের শিল্পীদের পরিবেশনায় বৈশাখকে বরণের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় আগেভাগে। পহেলা বৈশাখের দিন ভোরেই শুরু হয় বিভিন্ন স্থানে উম্মুক্ত কনসার্ট, বাউল, লালন, জারী-সারি, মুর্শেদী গানের আসর। আর শহুরে এ্যামিউজমেন্ট পার্কের স্বাদ থাকলেও পহেলা বৈশাখের দিন অন্তত নাগর দোলায় চড়তে চায় অনেক শিশুই।

বর্ষবরণের অন্যতম অনুসঙ্গ হল পান্তা-ইলিশ। যেন এই পান্তা-ইলিশ না হলে আর পহেলা বৈশাখের কোন আমেজই থাকে না। বেশ তো এই সুযোগে রমনার লেকের পাড়েই অনেকে বসে পড়েন ইলিশ পান্তা খেতে। সাথে থাকে কাঁচা মরিচ। মানে সম্পূর্ণ ভাবেই বাঙালিয়ানার পরিচয় দিতে যেন ব্যস্ত সবাই।

মঙ্গলশোভা যাত্রা :

বর্ষবরণের অনুষ্ঠান মালায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সালে এই শোভাযাত্রার প্রচলন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীরা। পহেলা বৈশাখের দিন সকাল গড়িয়ে যখন রমনা টি.এস.সি শাহবাগে মানুষের উপচে পরা ভিড় থাকে, তখন শুরু হয় মঙ্গলশোভা যাত্রা।

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে শোভাযাত্রা বের হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এখানে পশু পাখির মুখাকৃতির ছবিসহ গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা অনুসঙ্গকে ফুটিয়ে তোলা হয় নানা রং বেরং-এর মুখোশ ও আলপনার মাধ্যমে। ছেলে বুড়ো সবাই তখন মেতে ওঠে বর্ষবরণের মঙ্গলশোভা যাত্রার আনন্দে।

মেলা :

বৈশাখ মাস বলতে তো মেলার মাসকেই বোঝায়। একসময় শুধু গ্রাম গঞ্জে মেলা হলেও এখন এর পরিধি বিছিয়েছে শহরের বড়সর এপার্টমেন্ট ও হাই-সোসাইটিতেও। তবে পার্থক্য থাকে গ্রামের আর শহুরে মেলার। বাঁশের বেতের তৈজষ আর নানা জাতের খেলার সামগ্রী, নারকেল মুড়কিসহ আরো কত কি থাকে এসব মেলায়- তার ইয়ত্তা নেই। মেলার সময়ে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা, কুস্তির আসর বসে।

বাংলাদেশের চট্টগ্রামে লালদীঘীর ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় জব্বারের বলি খেলা। আর বর্ষবরণের এই মেলা প্রবাসীদের জন্য হয় মিলন মেলা। দীর্ঘ ব্যস্ততার অবসরে বৈশাখী মেলা প্রবাসী বাঙালিদের দেয় অফুরন্ত আনন্দ। জাপানে প্রতি বছরই অনেক ঘটা করে বিশাল পরিসরে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। জাপান প্রবাসীদের এ মিলন মেলার রেশটা থাকে সারা বছর জুড়ে। এছাড়া নিউইয়র্ক, লন্ডন কানাডাসহ বিশ্বের অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোতে বসে বৈশাখী মেলার আয়োজন।

হালখাতা :

প্রাচীন বর্ষবরণের রীতির সাথে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবেই জড়িত একটি বিষয় হল হালখাতা। তখন প্রত্যেকে চাষাবাদ বাবদ চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করে দিত। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ ভূমির মালিকরা তাদের প্রজা সাধারণের জন্য মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রাখতেন। যা পরবর্তিতে ব্যবসায়িক পরিমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানীরা সারা বছরের বাকীর খাতা সমাপ্ত করার জন্য পহেলা বৈশাখের দিনে নতুন সাজে বসে দোকানে। গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে শুরু করেন নতুন বছরের ব্যবসার সূচনা। এ উৎসব গুলো সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে পরিণত হয়েছে প্রতিটি বাঙালির ঘরে। এখনো গ্রাম গঞ্জে নববর্ষে হালখাতার হিড়িক পড়ে বাজার, বন্দর ও গঞ্জে।

আধুনিক নববর্ষের সূচনা :

আধুনিক নববর্ষ পালনের তত্ত্ব তালাশ করতে গিয়ে জানা গেল ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। এরপরে ১৯৮৩ সালে একই ভাবে ভাল কিছু উদ্যোগ নেয়া হয় নববর্ষ পালনের জন্য। মোদ্দা কথা ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়নি। এরপর থেকে প্রতিবছরই বাড়তে থাকে পহেলা বৈশাখ বরণের সাড়ম্বরতা।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

"স্বাগত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ"

সময় বহে নদীর মতো, স্রোতে তার দিনগণনা,

আদি মানব গুনেছে ক্ষণ, বুনেছে জীবনের বয়না।

আকাশভরা নক্ষত্রমালা, ঋতুর রঙিন আহ্বান,

তারই মাঝে জন্ম নিলো বাংলা বছরের গান।

কৃষকের ঘামে ভেজা মাঠে সময় হলো চিহ্নিত,

বীজ বোনা আর ফসল কাটায় দিনপঞ্জি সুস্পষ্ট।

সূর্যের পথে ঘুরে ঘুরে ঋতু দিলো বার্তা,

তাই তো গড়ে উঠলো কালে বারো মাসের চার্টা।

বিশাখা হতে বৈশাখ এলো, জ্যৈষ্ঠে জ্বলে রৌদ্রতাপ,

আষাঢ়-শ্রাবণ বৃষ্টি গেয়ে জাগায় মাটির আলাপ।

ভাদ্র নামে ধানের গন্ধ, আশ্বিন আনে হাওয়া,

কার্তিক-মাঘ শীতে মোড়া, ফাল্গুন বসন্ত ছাওয়া।

ইতিহাসে লেখা আছে আকবরের সেই দিন,

খাজনা তোলার অসামঞ্জস্য ভাঙতে চাইলেন তিনি তখনই চিন্তামগ্ন ঋণ।

হিজরীর সাথে মেলেনি যে কৃষির ফলের ছন্দ,

তাই তো এলো বাংলা সনের নতুন নিয়ম বন্দ।

ফতেহউল্লাহ সিরাজী তখন জ্যোতিষ জ্ঞানে দীপ্ত,

সূর্য-চন্দ্র মিলিয়ে দিলেন সময়ের নতুন নীতি।

ফসলি সন নাম নিয়ে শুরু হলো পথচলা,

ক্রমে তা বাংলা সনে পেলো জাতির আপন বলা।

পহেলা বৈশাখ এলেই তাই বাজে প্রাণের ঢাক,

রঙে রঙে ভরে ওঠে শহর, গ্রাম আর সব পাক।

লাল-সাদা শাড়ির আঁচল, পাঞ্জাবিতে রং,

আলপনায় আঁকা স্বপ্ন যেন জেগে ওঠে সংগ।

রমনার বটমূল জুড়ে ভোরের প্রথম গান,

“এসো হে বৈশাখ”—ডাকে জাগে জাতির প্রাণ।

ছায়ানটের সুরে মিশে ইতিহাসের রেশ,

সংগ্রামের সেই দিনগুলোয় জেগেছিলো দেশ।

মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে রঙিন স্বপ্ন বয়ে,

মুখোশ পরে মানুষ নামে আনন্দ জাগায় সয়ে।

গ্রামীণ রূপকথা যেন শহরে নামে নেমে,

ঐতিহ্যের রঙিন ডানায় ভবিষ্যৎকে নিয়ে।

পান্তা-ইলিশের টেবিলে বসে বাঙালির আত্মপরিচয়,

কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ সাথে স্মৃতির গন্ধ বই।

সরলতায় ভরা এই রীতি হৃদয় ছুঁয়ে যায়,

অতীত-বর্তমান মিলে নতুন সুরে গায়।

মেলার মাঠে বাঁশির সুরে শিশুরা হাসে খুশি,

নাগরদোলায় ঘুরে ঘুরে আনন্দ খুঁজে পুষি।

বেতের তৈরি খেলনা হাতে গ্রামবাংলার ছোঁয়া,

লাঠিখেলা, নৌকাবাইচে ঐতিহ্যের রোয়া।

হালখাতার সেই প্রথাটি আজও বাঁচে মনে,

পুরনো দেনা মিটিয়ে সবাই নতুন পথে রণে।

মিষ্টিমুখে শুরু হয় যে নতুন বছরের ডালি,

সম্পর্কের বন্ধন গাঁথে দোকানদার আর খদ্দার খালি।

শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বাজে বৈশাখী ঢোল,

লন্ডন, টোকিও, নিউইয়র্কে বাঙালির কলরোল।

প্রবাসে থেকেও তারা ভুলে না আপন মাটি,

বাংলা সনের ডাকে জাগে হৃদয়েরই ঘাটি।

ঝড় আসে, কালবৈশাখী ভাঙে ঘরের বাঁধ,

তবুও বাঙালি দাঁড়ায় আবার নতুন করে সাধ।

ধ্বংস পেরিয়ে গড়ে তোলে আশার নতুন ঘর,

নববর্ষের প্রতিটি দিন তাই সংগ্রামের পর।

ধর্ম-বর্ণ ভুলে গিয়ে সবাই মিলে এক,

বাংলা সনের প্রথম দিনে মিলনেরই রেক।

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়া এই উৎসব,

জাতির প্রাণে জাগিয়ে তোলে নতুন দিনের রব।

১৪৩৩ এল আজ, নতুন আলোর ডালি,

অশুভ যত দূরে সরুক, আসুক সুখের বালি।

স্বপ্ন গড়ার প্রত্যয়ে হোক আগামী পথচলা,

বাংলার মাটিতে ফুটুক মুক্তির নতুন বেলা।

সময়ের স্রোতে ভেসে যাক দুঃখের সব ভার,

নববর্ষে জাগুক আবার উন্নয়নের হাওয়ার ঝড়।

শ্রম, সংগ্রাম, ভালোবাসায় গড়ি সোনার দেশ,

বাংলা সনের প্রতিটি দিন হোক আলোর আবেশ।

 

স্বাগত হে নববর্ষ, স্বাগত নতুন দিন,

জাতির প্রাণে জ্বালাও তুমি আশার দীপ্তি-চিন।

১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, রাখো তোমার মান—

বাংলার বুক জুড়ে ফুটুক উন্নতির গান।

-(স্বাগত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,-সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

বৈশাখ এলেই এর সাথে আসে কালবৈশাখীল তান্ডবের কথা। প্রলয়ংকরী ঝড়ে লন্ডভন্ড করে বসত ভিটা, জমি জিরেত, তারপরেও আবারো ফিরে দাঁড়ায় ঝড়ঝঞ্জার সাথে লড়াই করা প্রতিটি বাঙালি। নতুন করে বাঁচার স্বপ্নে শুরু হয় ঘর বাঁধা। এসব দুঃখ-দূর্যোগকে ভুলে পুরো জাতিই মেতে ওঠে পহেলা বৈশাখের নববর্ষ পালনের আনন্দে। জাতীয় এই উৎসবটি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এদিনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বাংলা বছরের প্রথম দিনকে বরণের আনন্দে থাকে মাতোয়ারা। উৎসব প্রিয় বাঙালিরা জাতীয় উন্নয়নে এসব পার্বন থেকে নতুন সঞ্জিবণী শক্তি নিয়ে দেশের জন্য কাজ করলেই আর পিছিয়ে থাকবেনা আমার প্রিয় স্বদেশ, বাংলাদেশ। স্বাগতম বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। সকল অশুভ শক্তিকে পেছনে ফেলে নতুন দিনের শুভ সূচনা হোক, জাতি খুঁজে নিবে নতুন মুক্তির দিশারী।

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;