এই চিঠি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে নয়; এটি একজন সাধারণ নাগরিকের উদ্বেগ, একজন শিক্ষকের দায়বোধ এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে একজন সচেতন মানুষের আর্তি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের জনগণ আপনাকে এবং আপনার দলকে বিপুল সমর্থন দিয়েছে। জনগণ আপনাদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে এই বিশ্বাসে যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে। এ আস্থা ও প্রত্যাশা নিঃসন্দেহে আপনার জন্য যেমন একটি সম্মান, তেমনি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বও।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের মানুষ আজ ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা, গুঞ্জন ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ আমানতকারী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, প্রবাসী এবং বিনিয়োগকারী—সবার মনেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আমি জানি, একটি ব্যাংক কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়। একটি ব্যাংক মানে লাখো পরিবারের সঞ্চয়, সন্তানের শিক্ষার জন্য জমিয়ে রাখা অর্থ, বৃদ্ধ পিতা-মাতার চিকিৎসার নিরাপত্তা, প্রবাসীর রক্ত-ঘামে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্বপ্ন এবং অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যতের ভরসা।
ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা ভিন্ন নয়। প্রায় তিন কোটি গ্রাহকের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এর স্থিতিশীলতা শুধু একটি ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নয়; বরং এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থারও প্রতীক।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের মানুষ অতীতে বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, ব্যাংক লুটপাট এবং দুর্বল তদারকির কারণে বহুবার হতাশ হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে তাদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়েছে। সেই ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি।
এই বাস্তবতায় যদি দেশের বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর একটি সম্পর্কে মানুষের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তবে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ব্যাংক খাতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো জনগণের বিশ্বাস। একবার সেই বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে তা পুনর্গঠন করতে বছরের পর বছর সময় লাগে।
ইতিহাস বলে, ব্যাংক সংকটের সূচনা অনেক সময় আর্থিক দুর্বলতা দিয়ে নয়, বরং আস্থার সংকট দিয়ে হয়। যখন মানুষ মনে করে তাদের সঞ্চয় নিরাপদ নয়, তখন আতঙ্ক বাস্তবতার চেয়েও বড় সংকটে পরিণত হয়। এই কারণেই বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও ব্যাংকিং খাতে জন-আস্থা রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি বিশ্বাস করি, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অবশ্যই জরুরি। জবাবদিহিতা, সুশাসন ও সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু একইসঙ্গে এটিও সত্য যে, কোনো ব্যাংককে দুর্বল করা, জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে আমানতকারীরা নিজেদের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন—তা কখনই জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হতে পারে না।
আজ যদি ইসলামী ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কাল তার প্রভাব অন্য ব্যাংকেও পড়তে পারে। একটি ব্যাংকের সংকট দ্রুত পুরো খাতের সংকটে রূপ নিতে পারে। এর অভিঘাত অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর পড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকারও, ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রও।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আজ এমন একটি অবস্থানে আছেন, যেখানে আপনার একটি আশ্বাস, একটি সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান এবং একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ কোটি কোটি মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
দেশের মানুষ দেখতে চায়—
• ইসলামী ব্যাংকসহ সব ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে;
• ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে;
• কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিশেষ স্বার্থের কাছে জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জিম্মি হচ্ছে না;
• এবং সরকারের কাছে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত বিবেচনার ঊর্ধ্বে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নেওয়া হয়। দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষা তেমনই একটি দায়িত্ব।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনি এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেবেন না, যাতে সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়। আপনি এমন কোনো নজিরও প্রতিষ্ঠিত হতে দেবেন না, যাতে জনগণ মনে করে দেশের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনিশ্চয়তার মুখে অসহায়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কোটি আমানতকারীর স্বার্থ এবং জাতীয় আস্থার প্রশ্নে আপনার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটাই আমার বিনীত আবেদন। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে বাঁচানো মানে কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা নয়; বরং জনগণের বিশ্বাস, অর্থনীতির ভিত্তি এবং দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখা।
লেখক: ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়