সৌদি থেকে পালিয়ে আসা নারীদের একেকটি করুণ গল্প  

  • নিউজ ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মে ২৯, ২০১৮, ০২:৪১ পিএম

ঢাকা: পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে সৌদি আরব যাওয়া অসংখ্য নারী ভাগ্যের বিড়ম্বনায় কেবল নির্যাতনই পেয়েছেন। মাসের পর মাস শারীরিক-মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে অবশেষে শূণ্য হাতে দেশে ফিরেছেন তারা। শুধু নিয়ে এসেছে শারীরিক আর মানসিক ক্ষত। তাদের কেউ কয়েক মাস আগে, কেউবা বছর দেড়েক বা তারও আগে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। 

রবিবার (২৭ মে) সন্ধ্যায় অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফেরত আসা ৪০ নারী কর্মীর কাহিনি প্রায় অভিন্ন। এক দুর্বিষহ সময় পেরিয়ে দেশে ফিরে এসে তাঁরা সবাই অসহায় বোধ করছেন।

ফেনী দাগনভূঞার নারী বিবি রোজিনা। সৌদি আরবে তিন মাস ১৫ দিন থেকে রবিবার রাতে দেশে ফিরেছেন। আর্থিক সচ্ছলতার আশায় সেখানে কাজের জন্য গিয়ে হয়েছেন চরম নির্যাতনের শিকার। অনেকটা শূণ্যহাতে দেশে ফিরে পড়েছেন আরেক বিপাকে। বিমানবন্দরে তাঁকে গ্রহণের জন্য আসেনি পরিবারের সদস্যরা। স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারবেন কি না তা নিয়ে রয়েছেন সন্দিহান। 

গতকাল রাত সোয়া ৮টায় বিমানবন্দরের ২ নম্বর টার্মিনাল দিয়ে বের হচ্ছিলেন বিবি রোজিনা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মেয়ে সুমাইয়া বৈশাখী ছাড়া এখন আমার কেউ নেই। কেউ আসেনি আমাকে নিতে। সৌদি আরবে যেখানে কাজে ছিলাম, বাসার মালিক নির্যাতন করছে।’

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর নাছরিন আক্তার বলেন, ‘১৪ মাস জেল খেটে বহু কষ্টে দেশে আসছি। আমাকে কেউ নিতেও আসেনি। হাতে কোনো টাকা নেই। কোথায় যাব, কিভাবে যাব জানি না।’

একই ফ্লাইটে ফেরা সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সালমা বেগম বলেন, ‘একজন মহিলা দালালের মাধ্যমে গিয়ে কয়েক দিন সৌদির একটি বাসায় কাজ করেছি। শারীরিক নির্যাতন করায় সেখান থেকে পালিয়ে আসি।’

গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব গিয়ে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের নারীরা। বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় তাঁরা আউট পাস নিয়ে দেশে ফিরছেন।

তাঁদের অভিযোগ, অমানুষিক পরিশ্রম করানো হলেও বেতন দেওয়া হয় না, ঠিকমতো খাওয়া দেওয়া হয় না। কোনো কিছুতে আপত্তি হলেই চলে নির্মম নির্যাতন। অনেকের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। নির্যাতিত নারীরা পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফ হোম কিংবা ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অনেকে জেল খেটে দেশে ফিরছেন। তাঁদের বেশির ভাগকেই পরিবার গ্রহণ করতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার হাজেরা বেগমকে প্রতিদিন বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নির্যাতন করা হতো। টাঙ্গাইলের রুমানা বেগম বলেন, ‘তোরে টাকা দিয়ে কিনে আনছি, বেতন পাবি না। এমন কথা বলত মালিক।’ তিনি একজন গার্ডের সহায়তায় পালিয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেন। এরপর দেশে ফিরলেন।

নির্যাতনের শিকার হয়ে নারীকর্মীরা দেশে ফিরে আসার ঘটনায় এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, ‘আমরা বিষয়টির প্রতি নজর রাখছি। বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে আমাদের কর্মীরা তৎপর রয়েছেন।’

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেয়া তথ্য মতে, ২০১৭ সালে অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন। যা মোট অভিবাসন সংখ্যার ১৩ শতাংশ। ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত একা অভিবাসন প্রত্যাশী নারী শ্রমিককে অভিবাসনে বাধা দেয়া হলেও পরবর্তীতে ২০০৩ এবং ২০০৬ সালে কিছুটা শিথিল করা হয়।

২০০৪ সালের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারী শ্রমিকের অভিবাসন হার ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মোট অভিবাসনের ১৯ শতাংশ।

সোনালীনিউজ/জেএ