ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতির ঘোষণা

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ০৮:১০ এএম

চাঁদে অবতরণের জন্য তৈরি দুটি যান পরীক্ষা করতে দ্রুত প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিন ও স্পেসএক্সের তৈরি অবতরণযানের পাশাপাশি সংস্থাটির নিজস্ব রকেট ও মহাকাশযানকে আগামী বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক অভিযানের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির ব্যবস্থাপক জেরেমি পারসনস বলেছেন, এটি সম্ভবত এ যাবৎকালে পরিচালিত সবচেয়ে জটিল উৎক্ষেপণ অভিযান হতে যাচ্ছে।

 সিএনএনের খবরে বলা হয়, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এ বিষয়ে নতুন তথ্য জানিয়েছে নাসা। এক সংবাদ সম্মেলনে নাসার প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেন, ‘আরও সময়, আরও অর্থ ব্যয় করা এবং কম উড্ডয়ন করলেই আমাদের কাজ আরও নিরাপদ বা সহজে অর্জনযোগ্য হবে- এমন ভ্রান্ত ধারণায় আমরা নিজেদের বিভ্রান্ত করব না।’ ২০২৮ সালে নভোচারীদের চাঁদে অবতরণের আগে আগামী বছর পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে পরীক্ষামূলক অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

নাসার কাছ থেকে ব্লু অরিজিন ও স্পেসএক্স- দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই নাসার কয়েকশ কোটি ডলারের চুক্তি রয়েছে। তাদের তৈরি যান দিয়ে নাসার ওরিয়ন মহাকাশযান থেকে নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে নামানো হবে। আইজ্যাকম্যান বলেন, ‘প্রতিটি সরবরাহকারী ও অংশীদারের বোঝা উচিত, নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়লে নাসার কর্মীরা দরজায় হাজির হবেন। তারা শুধু পর্যবেক্ষণ করতে, প্রতিবেদন লিখতে বা কমিটি গঠন করতে আসবেন না; বরং তারা সরাসরি কাজে নেমে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত থাকবেন।’

ফেব্রুয়ারিতে নাসার নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর আইজ্যাকম্যান চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনেন। এতে ২০২৭ সালে একটি পরীক্ষামূলক অভিযান যুক্ত করা হয়। আর্টেমিস-৩ নামের এই অভিযানে ব্লু অরিজিন ও স্পেসএক্সের যান ওরিয়নের সঙ্গে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে সংযুক্ত হওয়ার অনুশীলন করবে। পৃথিবী থেকে কয়েক শ মাইল ওপরের এই কক্ষপথ চাঁদের তুলনায় অনেক কাছাকাছি। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল বা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার।

আনুমানিক ১৪ দিনের এই পরীক্ষামূলক অভিযানে তিনটি বিশাল রকেট উৎক্ষেপণ করতে হবে। পাশাপাশি নভোচারীবাহী ওরিয়ন মহাকাশযানকে পরীক্ষামূলক যানগুলোর সঙ্গে একাধিকবার সংযুক্ত ও বিচ্ছিন্ন করার কাজও চলবে। আর্টেমিস-৩-এর মাধ্যমে আর্টেমিস-৪ অভিযানে কোন অবতরণযান ব্যবহার করা হবে, তা যাচাই করা হবে। আর্টেমিস-৪-এর লক্ষ্য হলো ১৯৭২ সালে নাসার অ্যাপোলো কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করানো।

স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিন সম্পূর্ণ ভিন্ন নকশার যান তৈরি করছে। ২০২১ সালে প্রথম চন্দ্র অবতরণযান তৈরির চুক্তি পাওয়া স্পেসএক্স তাদের বিশাল স্টারশিপ উৎক্ষেপণযান ব্যবহার করতে চায়। যানটি এখনো উন্নয়নাধীন, তবে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো কক্ষপথে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে।

স্টারশিপ দুটি অংশ নিয়ে তৈরি- সুপার হেভি রকেট বুস্টার এবং ওপরের স্টারশিপ মহাকাশযান। ১৭১ ফুট উঁচু এই মহাকাশযানে নিজস্ব ছয়টি রকেট ইঞ্জিন রয়েছে। স্টারশিপ একই সঙ্গে চাঁদে অবতরণযান ও রকেটের ওপরের ধাপ হিসেবে কাজ করবে। মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে আগে কখনো এ ধরনের যান ওড়ানো হয়নি। অন্যদিকে, ব্লু অরিজিনের ব্লু মুন মার্ক-২ প্রচলিত চন্দ্র অবতরণযানের নকশার অনেক কাছাকাছি। প্রতিষ্ঠানটির নিউ গ্লেন রকেটের কার্গো অংশে করে এটি উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। ৫২ ফুট উঁচু যানটির চেহারা নাসার অ্যাপোলো অবতরণযানের বড় সংস্করণের মতো। 

ব্লু মুন এখনো পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করেনি। এ বছর ব্লু মুন মার্ক-১ নামে এর ছোট, মালামাল বহনকারী সংস্করণ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মে মাসে নিয়মিত ভূমি পরীক্ষার সময় নিউ গ্লেন রকেট বিস্ফোরিত হয়ে ফ্লোরিডায় প্রতিষ্ঠানটির উৎক্ষেপণকেন্দ্র ধ্বংস হওয়ার পর পরিকল্পনাটি স্থগিত করা হয়। আর্টেমিস-৩ বা আর্টেমিস-৪ অভিযানের আগে ব্লু অরিজিন ও স্পেসএক্সের যান দুটিকে আরও অনেক পরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কোনো যানই এখন পর্যন্ত নভোচারী নিয়ে উড়েনি বা নভোচারীবাহী মহাকাশযানের সঙ্গে সংযুক্ত হয়নি।

শুক্রবারের বৈঠকে নাসা আর্টেমিস কর্মসূচির অন্যান্য ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযানের উৎপাদন দ্রুত করা এবং নকশায় পরিবর্তন আনা। পাশাপাশি হিউস্টনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সিওমের তৈরি চাঁদে হাঁটার পোশাকের সহজ ও হালকা সংস্করণ তৈরির অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

আর্টেমিস কর্মসূচির ব্যবস্থাপক পারসনস বলেন, ‘প্রায় সব ক্ষেত্রেই নাসা ‘কাজ সহজ করার এবং কঠিন শর্তগুলো বাদ দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে বর্তমানে চন্দ্র অবতরণযানগুলোই নাসার সময়সূচি নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।’ আর্টেমিস-৩ অভিযানে ব্যবহারের জন্য ব্লু মুনের যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ চলছে। অন্যদিকে, স্পেসএক্স আগামী বছর উৎপাদন লাইন থেকে তুলনামূলকভাবে সাধারণ নকশার একটি স্টারশিপ বের করে পরীক্ষামূলক অভিযানে পাঠাবে। প্রতিষ্ঠানটি তখনও যানটির নকশায় পরিবর্তন আনতে থাকবে।

সময়সীমা নিয়ে চাপ

আর্টেমিস কর্মসূচির নতুন সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে স্পেসএক্সকে আর্টেমিস-৩ অভিযানের জন্য স্টারশিপের প্রোটোটাইপ তৈরি শেষ করতে হবে। পাশাপাশি যানটির অবতরণ পা ও এয়ারলক পরীক্ষা করতে সম্পন্ন করতে হবে কয়েকটি প্রযুক্তিগত প্রদর্শনী। 

এদিকে স্টারশিপের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও চলবে। এর অংশ হিসেবে ফ্লোরিডার দুটি নতুন উৎক্ষেপণকেন্দ্রে কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং পৃথিবীর কক্ষপথে দুটি স্টারশিপের মধ্যে জ্বালানি স্থানান্তরের প্রথম মহড়া চালানো হবে।

চাঁদে পৌঁছানোর জন্য বিশাল স্টারশিপে জ্বালানি ভরতে এই স্থানান্তর জরুরি। পৃথিবীর কক্ষপথে দুটি যানের মধ্যে অতি ঠান্ডা ক্রায়োজেনিক জ্বালানি স্থানান্তরের কাজ আগে কখনো করা হয়নি। ২০২৭ সালের শুরুর দিকে হওয়ার কথা স্পেসএক্সের প্রথম প্রদর্শনী।

চাঁদে অবতরণের জন্য স্পেসএক্সকে একাধিকবার জ্বালানি ভরার উদ্দেশ্যে রকেট উৎক্ষেপণ করতে হবে। আগে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন, এ জন্য ১০ থেকে ৪০টি উৎক্ষেপণ প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক এ সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, চাঁদে অবতরণের জন্য ছয় থেকে আটটি উৎক্ষেপণ লাগবে।

শুক্রবার নাসার কর্মকর্তারা মাস্কের এই হিসাব নিশ্চিত করেছেন। তবে জ্বালানি স্থানান্তরের পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সংখ্যা জানা সম্ভব হবে না বলে তারা উল্লেখ করেছেন। চাঁদের উদ্দেশে যাত্রার আগে ব্লু অরিজিনের ব্লু মুন মার্ক-২-কেও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে জটিল প্রস্তুতি নিতে হবে। শুক্রবার নাসা জানিয়েছে, অবতরণযানটিকে অন্তত তিনটি বুস্টার ধাপের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে।

ব্লু অরিজিনেরও অনেক কাজ বাকি। প্রতিষ্ঠানটিকে নিউ গ্লেন রকেটের উড্ডয়ন আবার শুরু করতে হবে, যা বছরের শেষ নাগাদ হতে পারে। পাশাপাশি বিলম্বিত ব্লু মুন মার্ক-১-এর পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন আগামী বছরের শুরুর দিকে সম্পন্ন করতে হবে। আর্টেমিস-৩-এ ব্যবহৃত ব্লু মুন মার্ক-২-তে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও যুক্ত করতে হবে। অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযানে থাকা চার নভোচারী সংযুক্ত অবস্থায় মার্ক-২-তে উঠবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

স্টারশিপের ক্ষেত্রে একই পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা নেই নাসার। স্পেসএক্সের ড্রাগন মহাকাশযানে নভোচারী বহনের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, আর্টেমিস-৩ অভিযানের বাইরে থেকেই তারা স্টারশিপের জীবনধারণব্যবস্থা যথাযথভাবে পরীক্ষা করতে পারবে বলে মনে করছে।

আর্টেমিস-৩-এর পর ব্লু মুন মার্ক-২ ও স্টারশিপ- দুটি যানই নভোচারী ছাড়াই চাঁদে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে অবতরণের অনুশীলন করা হবে। তবে আর্টেমিস-৪ অভিযানে কোন যান ব্যবহার করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত করেনি নাসা। গত বছর স্পেসএক্সকে ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, যে যানটি আগে প্রস্তুত হবে, সেটিই ব্যবহার করা হবে। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যে অভিযানের সময়সূচি নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে নাসা জানিয়েছিল।

বর্তমানে আর্টেমিস-৪ অভিযান ২০২৮ সালের শুরুর দিকে নির্ধারিত রয়েছে। একই বছরের পরবর্তী সময়ে আর্টেমিস-৫-এর মাধ্যমে দ্বিতীয়বার নভোচারীদের চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এম