টানা ১২ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের দরজায় পৌঁছান একজন শিক্ষার্থী। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, এরপর কলেজ। প্রতিটি ধাপে পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠার সুযোগ। অথচ এত দীর্ঘ পথ পেরিয়েও এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী। পাসের হার নেমেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত দুই দশকের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন। এই ফলাফল কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার চিত্র নয়। এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, বৈষম্য ও জবাবদিহির ঘাটতিকে সামনে এনেছে। কেন এই ফল বিপর্যয় আর এর জন্য দায়ী বা কারা আজকের সোনালীনিউজের বিশ্লেষণে খোঁজবো সেই উত্তর।
২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এরপর বিভিন্ন সময়ে পাসের হার বেড়েছে। ২০২০ সালে পরীক্ষা ছাড়াই আগের ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নের কারণে পাসের হার ছিল শতভাগ। ২০২১ সালেও তা ছিল ৯৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতে পাসের হার কমলেও ২০২৪ সালে ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে। এবার আরও কমে হয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
দুই বছরে পাসের হার কমেছে ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ পয়েন্ট। এই পতনকে শুধু একটি পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীরা কি যথাযথভাবে শিখছেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করছে? আর শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এত দিন আড়ালে ছিল কেন?
শ্রেণি পার হচ্ছে, শিখছে কতটা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, শিক্ষার্থীরা একের পর এক শ্রেণি পার হলেও প্রত্যাশিত শিখন অর্জন করতে পারছেন না। প্রাথমিক পর্যায়ের ঘাটতি নিয়ে তারা মাধ্যমিকে উঠছেন। মাধ্যমিকের দুর্বলতা নিয়েই পৌঁছাচ্ছেন উচ্চমাধ্যমিকে। ফলে কলেজের দুই বছরে আগের ১২ বছরের ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইংরেজি ও আইসিটিতে দুর্বলতা
এই পর্যবেক্ষণ শিক্ষাব্যবস্থার একটি মৌলিক সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়া আর প্রকৃত শিক্ষা অর্জন এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উঠলেও বাংলা, ইংরেজি, গণিত কিংবা তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন না করলে পরের স্তরে গিয়ে সমস্যায় পড়বেন। দীর্ঘদিনের সেই দুর্বলতা একপর্যায়ে বড় পরীক্ষার ফলাফলে প্রকাশ পেতে পারে।
এবার ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে দুর্বল ফল সেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। অথচ উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ ভাষার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। আইসিটির ক্ষেত্রেও শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হাতে-কলমে শেখার সুযোগ।
মানসম্মত শিক্ষার জন্য দক্ষ শিক্ষকের অভাব
শিক্ষার মানের সঙ্গে শিক্ষকসংকটের সম্পর্ক সরাসরি। অধ্যাপক মজিবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় কম শিক্ষক রয়েছেন। কোথাও নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক নেই। ফলে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে।জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কলেজে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ৬৫৬টি প্রভাষক পদ শূন্য। সদ্য সরকারি হওয়া কলেজে নন-ক্যাডার প্রভাষকের শূন্য পদ ২ হাজার ৪১০টি। এ ছাড়া বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের ১ হাজার ৩৪৯টি পদ শূন্য রয়েছে।
ব্যানবেইসের তথ্যেও কলেজে শিক্ষকসংখ্যা কমার চিত্র পাওয়া যায়। ২০২২ সালে বিভিন্ন ধরনের কলেজে শিক্ষক ছিলেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭ জন। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৮৯ জনে। দুই বছরে শিক্ষক কমেছে ১০ হাজারের বেশি।
দক্ষতা ও অবকাঠামোর ঘাটতি
শুধু শিক্ষকসংখ্যা নয়, রয়েছে দক্ষতা ও অবকাঠামোর ঘাটতিও। ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২০৭টি কলেজে কম্পিউটার সুবিধা নেই। এর মধ্যে ১৬৪টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ। কোথাও কম্পিউটার আছে, কিন্তু প্রশিক্ষক নেই। কোথাও প্রশিক্ষক থাকলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অকার্যকর।
এমন পরিস্থিতিতে আইসিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফল আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। শহরের সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও বাড়তি শিক্ষাসহায়তা পাওয়ার সুযোগ পান। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের অনেকের সেই সুযোগ নেই। ফলে একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও সবার প্রস্তুতির পরিবেশ এক নয়।
প্রতিষ্ঠান বাড়লেও মান নিশ্চিত হয়নি
দেশে কলেজের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু সেই বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার মান, শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বয় কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ব্যানবেইসের হিসাবে, ২০১০ সালে দেশে কলেজশিক্ষার আওতায় প্রতিষ্ঠান ছিল ৩ হাজার ৩২৪টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৮৭৬টি। অর্থাৎ ১৪ বছরে প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১ হাজার ৫৫২টি।
আপস
কিন্তু প্রতিষ্ঠান বাড়লেই শিক্ষার সুযোগ কার্যকর হয় না। প্রয়োজনীয় শিক্ষক, পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না হলে নতুন প্রতিষ্ঠানও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত শিক্ষা দিতে পারবে না। চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রথম ধাপে ৪১৬টি কলেজ-মাদরাসা কোনো শিক্ষার্থী পায়নি। প্রায় ৮০০ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে মাত্র ১ থেকে ১০ জন। এই চিত্র প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা ও শিক্ষার্থীর চাহিদার মধ্যে অসংগতির প্রশ্ন সামনে আনে।
প্রতিষ্ঠান স্থাপনের আগে স্থানীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা, যাতায়াতের সুযোগ, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনা করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিষ্ঠান থাকবে, কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মতো জনবল ও সম্পদ থাকবে না।
ফলাফলের বৈষম্যেও উদ্বেগের
এবার বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে বরিশাল বোর্ডে তা ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের পাঁচটিতেই পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে। এই পার্থক্যের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষকের প্রাপ্যতা, প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, আর্থিক অবস্থা ও আঞ্চলিক বৈষম্য-সবকিছুই বিশ্লেষণে আনতে হবে। শুধু বোর্ডের গড় ফল দেখে কোনো অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীও মনে করেন, আর্থিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য শিক্ষার সুযোগকে প্রভাবিত করছে। সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো সুযোগ পেলেও অসচ্ছল পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছেন। এই বৈষম্য কমাতে না পারলে সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন, প্রয়োজন গবেষণা
পাসের হার হঠাৎ কমে যাওয়ায় উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। অতীতে উদারভাবে খাতা মূল্যায়নের কারণে কোনো কোনো শিক্ষার্থী প্রকৃত যোগ্যতার তুলনায় ভালো ফল করেছেন কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদেরা। তবে এমন অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমানের মতে, এবারের ফল খারাপ হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে নমুনাভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। একইভাবে অধ্যাপক মজিবুর রহমান মনে করেন, মূল্যায়ন নীতিমালার প্রভাবও পর্যালোচনা করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যার বদলে প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান করা। বিষয়ভিত্তিক ফল, আগের পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা, প্রশ্নপত্রের ধরন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের নিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পার্থক্য বিশ্লেষণ করতে হবে। তবেই বোঝা যাবে, ফলের পতন কতটা শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতির কারণে, কতটা মূল্যায়নপদ্ধতির পরিবর্তনে এবং কতটা অন্যান্য পরিস্থিতির প্রভাবে ঘটেছে।
ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি নয়, সহযোগিতা
যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার খুব কম কিংবা কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেননি, সেগুলোকে আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষকসংকট, পাঠদানের মান, ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে। আবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো চর্চাও খুঁজে বের করে অন্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে শুধু ফলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দুর্বল প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সহায়তা, নিয়মিত তদারকি, অতিরিক্ত ক্লাস এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা জরুরি।
ফল বিপর্যয়ে দায় কার?
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও বিবেচনায় নিতে হবে। এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগের পাশাপাশি বেশি বিষয়ে অকৃতকার্যদের জন্যও বিকল্প পথ তৈরি করা প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তাদের কর্মসংস্থানের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
এবারের এইচএসসি ফলাফলকে তাই কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার খতিয়ান হিসেবে দেখলে চলবে না। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিখনঘাটতি, শিক্ষকসংকট, সুযোগের বৈষম্য, অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি এবং জবাবদিহির প্রশ্ন। শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হয়েছেন-কিন্তু তাদের ব্যর্থতার পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার দায় কতটা, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
শিক্ষার্থীরা শিখছে না দায় নিচ্ছে কে?
পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সাময়িক আলোচনা হয়, আশ্বাস আসে, তারপর সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে—এমন চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন নিরপেক্ষ গবেষণা, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং কার্যকর সংস্কার। কারণ, পাসের হার বাড়ানোই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য নয়। প্রকৃত লক্ষ্য হলো এমন শিক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে একজন শিক্ষার্থী শ্রেণি পার হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতাও অর্জন করতে পারেন। সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে পরের বছরও একই প্রশ্ন উঠবে—শিক্ষার্থীরা শিখছেন না কেন, আর দায় নিচ্ছে কে?
এসএইচ