বেপরোয়া অটোরিকশার নেপথ্যে প্রভাবশালী চক্র

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
ফাইল ছবি

রাজধানী ঢাকার সড়কব্যবস্থা এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপটে প্রায় দিশেহারা। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অলিগলি-সর্বত্রই তিন চাকার এই বাহনের বেপরোয়া চলাচল। ট্রাফিক নিয়ম না মেনে চলার কারণে দিন দিন বাড়ছে তীব্র যানজট ও মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা।

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল প্রান্তিক চালকদের জীবিকার আন্দোলন মনে হলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক শক্তিশালী বিনিয়োগকারী চক্রের নাম।

মাঠপর্যায়ের তথ্যে দেখা যায়, ঢাকার রাজপথে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নামানোর মূল কারিগর উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালিরা। সাধারণ গ্যারেজ মালিকদের হাত পেরিয়ে এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এখন চলে গেছে সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী বাড়িওয়ালাদের হাতে।

অল্প পুঁজিতে দ্বিগুণ ও স্থায়ী লাভ পাওয়ার আশায় তারা নিয়মিত টাকা ঢালছেন এই খাতে। মাত্র ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা খরচ করে একটি নতুন অটোরিকশা তৈরি করে চালকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিনিময়ে প্রতি রিকশা থেকে দৈনিক জমা নেওয়া হয় ৫০০ টাকা। ফলে প্রতি মাসে একটি রিকশা থেকে মালিকের পকেটে ঢোকে ১৫ হাজার টাকা, যা বছরে দাঁড়ায় অন্তত ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। এই বিপুল লাভের মুখ দেখেই শহরের মোড়ে মোড়ে বাড়ছে অটোরিকশার সংখ্যা।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় অন্তত চার হাজার অবৈধ অটোরিকশা গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। এসব গ্যারেজের অধীনে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাজপথে নামছে।

গ্রাম থেকে আসা প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত মানুষ কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই এসব বিপজ্জনক যান নিয়ে নেমে পড়ছেন রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত সড়কগুলোতে। আইনি নিবন্ধনহীন এসব যান প্রধান সড়কের স্বাভাবিক গতি স্তব্ধ করে দিচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।

সড়কে কোনো বিশৃঙ্খলা হলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে ট্রাফিক পুলিশ কেবল অসচ্ছল চালকদের আটক করে কিংবা আর্থিক জরিমানা আদায় করে। অথচ যেসব প্রভাবশালী কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিদিন হাজার হাজার অবৈধ গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছেন, তারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রিকশা চালকদের দাবি, অবৈধ অটোরিকশা তৈরি করার কারখানা, সরঞ্জাম আমদানিকারক ও গ্যারেজ মালিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল সড়কপর্যায়ে অসহায় চালকদের সাজা দেওয়া সমাধান আনবে না।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সমাজ গবেষকদের মতে, প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে তা নগরবাসীর সড়ক নিরাপত্তার বিনিময়ে হতে পারে না। ঢাকার মূল ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে পুলিশকে কেবল চালকদের ওপর জরিমানা চাপানোর কৌশল থেকে সরে আসতে হবে। 

অবৈধ কারখানা সিলগালা করা, বেআইনি গ্যারেজ উচ্ছেদ করা এবং এর পেছনে থাকা উচ্চবিত্তদের আইনের আওতায় আনাই এখন একমাত্র সমাধান। মূল উৎসে আঘাত না হানলে রাজধানীর সড়ক খাতকে চিরতরে অচল করে দেবে এই তিন চাকার নৈরাজ্য।

এসএইচ