ফাইল ছবি
বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে। দুই পক্ষের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের ফলাফলের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন—কোন দলের দিকে ভাগ্যের পাল্লা ভারী হবে এবং কে সরকার গঠন করবে, সেটাই এখন দেশবাসীর প্রধান অপেক্ষা। এছাড়া দুই বড় আঞ্চলিক শক্তির চোখও রয়েছে এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। কারণ চীন বাংলাদেশে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটার পর এটাই প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ উপেক্ষা করে ভারত তাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।
প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ শেখ হাসিনার আমলে চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, তবে তখন প্রধান অংশীদার ছিল ভারত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থা এখন পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে।
চীনের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে বাংলাদেশের
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কারলানজিকের মতে, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং আগামী সরকারও প্রকৃতপক্ষে চীনের দিকে ঝুঁকছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন চীনের বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত পরিকল্পনার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে এবং বেইজিং ক্রমশ আস্থা পাচ্ছে যে ঢাকা এই পরিকল্পনায় চীনের পক্ষে ভূমিকা পালন করবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীনে, যা কৌশলগত পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি বিমানঘাঁটিতে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেলওয়ার হোসেনের মতে, ‘নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও গভীরতর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই দৃঢ়।’
অব্যাহত উত্তেজনা
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক ক্রমাগত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কথিত সহিংসতাকে ‘সংখ্যালঘুদের প্রতি অবিরাম শত্রুতা’ বলে নিন্দা করেছে।
পুলিশের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০ জন নিহত হয়েছেন।
তবে বাংলাদেশের অভিযোগ, ভারত সহিংসতার মাত্রাকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করছে। এরপরও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য কিছু ছড়ানো-ছিটানো উদ্যোগ লক্ষ্য করা গেছে।
গত জানুয়ারিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসেছিলেন। বিএনপিকে আসন্ন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার ছেলে তারেক রহমানকে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে ৬০ বছর বয়সী তারেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীর প্রতিবাদের মুখে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
বিশৃঙ্খলার চেয়ে স্থিতিশীলতা অগ্রাধিকার
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ দোনথির মতে, উভয় পক্ষই বাস্তববাদী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তিনি বলেন, ‘নয়াদিল্লি ও ঢাকা—দুই পক্ষই সম্পর্কের এই অবনতির খেসারত সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন।’
ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশ যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় পর গত জানুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন সরকার সম্ভবত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো বড় ক্ষতি না করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
দোনথি বলেন, ‘নতুন ব্যবস্থা সম্ভবত বিশৃঙ্খলার চেয়ে স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেবে।’
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরের মতে, নির্বাচিত সরকারের অধীনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল হতে পারে, বিশেষ করে বিএনপি জয়ী হলে।
তিনি বলেন, এমনকি একসময় ভারতের তীব্র বিরোধী ইসলামপন্থী দল জামায়াতও নির্বাচনী প্রচারে ‘বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি’ গ্রহণ করেছে।
তীব্র বাক্যবিনিময় সত্ত্বেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূল ভিত্তি এখনও অটুট রয়েছে। বাণিজ্য স্থিতিশীল আছে এবং হাসিনা আমলের অধিকাংশ দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মধ্যে মাত্র একটি—ভারতীয় টাগবোট সংক্রান্ত চুক্তি—বাতিল হয়েছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক উপ-হাইকমিশনার দিলীপ সিনহা বলেন, ‘চীন যেভাবে অবকাঠামো গড়ে তোলে, ভারতের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কিন্তু বিদ্যুৎ ও তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল যেমন সুতা—যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি—তা ভারতই সরবরাহ করে।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অনিবার্যভাবে মজবুত হলেও তা ভারতের সঙ্গে শত্রুতা সৃষ্টি করবে না।
হুমায়ুন কবিরের মতে, ‘এটা কোনো একটা পক্ষ বেছে নেওয়ার (চীন না ভারত) বিষয় নয়। দুটো সম্পর্কই একসঙ্গে সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।’
এসবিআর


















-20260209104916.jpg)




















