দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে দৃশ্যমান হচ্ছে এক নীরব পরিবর্তন। একসময় যেখানে ইরি-বোরো ধানের সবুজে ভরে থাকত মাঠ, এখন সেখানে ক্রমেই জায়গা দখল করছে অর্থকরী ফসল সয়াবিন। উৎপাদন খরচ কম, সেচের প্রয়োজন কম এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় বরিশালের কৃষকরা ধান চাষ থেকে সরে এসে সয়াবিনের দিকে ঝুঁকছেন।
সরেজমিনে বরিশাল সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ জমিতে এখন সয়াবিনের চাষ হচ্ছে। কৃষকদের মতে, ধান চাষে বাড়তি খরচ ও কম লাভের কারণে তারা বিকল্প হিসেবে সয়াবিনকে বেছে নিচ্ছেন। চলতি মৌসুমে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় সয়াবিন আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর সয়াবিন আবাদ বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
কৃষি অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ রবি মৌসুমে যেখানে ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদ হয়েছিল, চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টরে। একই সময়ে ধান ও অন্যান্য রবি ফসলের আবাদ কমেছে প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে,সয়াবিন চাষ বৃদ্ধির ফলে একদিকে যেমন কৃষকদের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে ধান ও অন্যান্য রবি ফসলের আবাদ কিছুটা কমছে। পরিকল্পিতভাবে এই পরিবর্তন পরিচালিত হলে এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে সয়াবিন উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়লে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।
কৃষকদের হিসাব বলছে, ইরি-বোরো ধান চাষে প্রতি হেক্টরে ব্যয় হয় প্রায় ৮৫ থেকে ৯৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে সয়াবিন চাষে ব্যয় তুলনামূলক অনেক কম। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি সয়াবিন ৬৫ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কৃষকদের ভালো মুনাফা এনে দিচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী,ইরি-বোরো ধানে মণপ্রতি খরচ ১৭০০ থেকে ১৯০০ টাকা, বিক্রি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। সয়াবিনে মণপ্রতি খরচ ৭৫০ থেকে ১১০০ টাকা, বিক্রি ১৮০০ থেকে ২২০০ টাকা। এই পার্থক্যের কারণে কৃষকরা ধান থেকে সরে এসে সয়াবিনের দিকে ঝুঁকছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সয়াবিন চাষে খরচ কম হওয়ায় এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মাটিতে সয়াবিন ভালো ফলন দেয় এবং কম পানিতে চাষ করা সম্ভব হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প হয়ে উঠেছে।
বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের কৃষক আকরাম মৃধা বলেন, ধান চাষে যে খরচ হয়, সয়াবিনে তার অর্ধেক লাগে। শ্রমও কম লাগে। তাই লাভ বেশি হয়।
একই এলাকার কৃষক আজিজ জানান, সয়াবিনের বড় সুবিধা হলো আগাম ক্রেতা পাওয়া যায়। নোয়াখালী থেকে ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই ক্ষেত কিনে নেয়। ফলে বাজার নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।
বরিশাল সদর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন বলেন,কৃষি এখন ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক খাতে রূপ নিচ্ছে। কৃষকরা লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন, যা ইতিবাচক। সয়াবিন চাষ বাড়লেও খাদ্য সংকটের আশঙ্কা নেই। কৃষির বহুমুখীকরণই বর্তমান সময়ের চাহিদা এবং সয়াবিন চাষ সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।
এম







































