ফাইল ছবি
রূপালী পর্দার ‘থালাপতি’ যখন বাস্তবের রাজনীতির ময়দানে পা রেখেছেন, তখন থেকেই তাকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রথম প্রশাসনিক পদক্ষেপেই বড়সড় ধাক্কা খেলেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া থালাপতি বিজয়। ব্যক্তিগত জ্যোতিষীকে সরকারি উচ্চপদে বসিয়ে যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি, তীব্র সমালোচনার মুখে বুধবার সেই অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে তার সরকার।
মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জ্যোতিষী রিকি রাধান পণ্ডিত ভেট্রিভেলকে ‘অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি’ (ওএসডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার একটি আদেশ গত কয়েকদিন ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ঝড় তোলে। বুধবার বিধানসভায় বিরোধীদের তোপ আর জোট শরিকদের আপত্তির মুখে সেই বিতর্কিত নিয়োগ আদেশ বাতিল করার ঘোষণা দেওয়া হয়। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পেছনে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবকে স্থান দেওয়া নিয়ে খোদ বিজয়ের প্রজ্ঞা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। কংগ্রেস, বাম দল এবং ডিএমডিকে-র মতো শরিকদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে হয়েছে বিজয়কে। কিন্তু আস্থা ভোটের রেশ কাটতে না কাটতেই এই নিয়োগ নিয়ে বিধানসভা উত্তাল হয়ে ওঠে। ডিএমডিকে সাধারণ সম্পাদক প্রেমলতা বিজয়কান্ত কড়া ভাষায় এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, একজন জ্যোতিষীকে ওএসডি পদে বসানো অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং সাংবিধানিক পদের অবমাননা। এমনকি মিত্রপক্ষ ভিসিকে-র পক্ষ থেকেও সরকারের কাছে এই নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিজয়ের রাজনৈতিক দল ‘তামিলনাড়ু ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) শুরু থেকেই প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী রাজনীতির কথা বলে আসছিল। সেখানে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে জ্যোতিষীর এমন প্রভাব দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেবল বিরোধী ডিএমকে নয়, জোটের প্রধান শরিক কংগ্রেসও ভেতরে-ভেতরে এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে। চারিদিকের এই সাঁড়াশি চাপের মুখে নিজের অবস্থান ধরে রাখা বিজয়ের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ক্ষমতায় আসার পরপরই ৭১৭টি মদের দোকান বন্ধের সাহসী নির্দেশ দিয়ে বিজয়ী বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু জ্যোতিষীকাণ্ড সেই সাফল্যকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, থালাপতি কি তবে প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে অলৌকিক শক্তির ওপর বেশি ভরসা করছেন?
অবশেষে বিতর্ক এড়াতে এবং জোটের স্থিতিশীলতা রক্ষায় রথিন পাণ্ডের নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দিয়ে বিজয় যেন এক প্রকার রাজনৈতিক পরিপক্কতারই পরিচয় দিলেন। রূপালী পর্দায় অনায়াসে ভিলেনকে পরাজিত করা গেলেও রাজনীতির মাঠে যে প্রতিটি পদক্ষেপ মেপে ফেলতে হয়, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রথম মাসেই সেই কঠিন পাঠ নিলেন থালাপতি বিজয়।
জনমত ও যুক্তির কাছে এই নতিস্বীকার বিজয়ের সরকারের জন্য যেমন একটি হোঁচট, তেমনি গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবেও দেখছেন অনেকে। এখন দেখার বিষয়, এই ধাক্কা সামলে থালাপতি তার ‘তামিলনাড়ু মডেল’কে কতটা যুক্তিবাদী ও গতিশীল পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।
এসএইচ







































