• ঢাকা
  • সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

আইএমএফ থেকে কী পেল বাংলাদেশ: ঋণের আশ্বাস নাকি নতুন শর্ত?


আবদুল হাকিম, ব্যাংক (থাইল্যান্ড) থেকে ফিরে অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম
আইএমএফ থেকে কী পেল বাংলাদেশ: ঋণের আশ্বাস নাকি নতুন শর্ত?

ছবি : প্রতিনিধি

ঢাকা: বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা শেষে বাংলাদেশের প্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অর্থায়ন, অর্থনৈতিক সংস্কারে সহযোগিতা এবং নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগোলেও আইএমএফের কাছ থেকে নতুন ঋণের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো মেলেনি। বরং ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এবারের সভার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে এসব আলোচনাকে নতুন অর্থ ছাড় বা ঋণ অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কারণ সভা থেকে তাৎক্ষণিক কোনো নতুন ঋণ অনুমোদন বা অর্থ ছাড়ের ঘোষণা আসেনি। প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়ে দুই পক্ষের আলোচনা হয়েছে। সরকার আশা করছে, চলমান আলোচনা ও পরবর্তী দর-কষাকষির মাধ্যমে বছরের শেষ নাগাদ নতুন ঋণ চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী জানান, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। গত সরকারের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে সংস্থাটি সন্তুষ্ট বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে নতুন কর্মসূচির শর্ত ও অর্থের পরিমাণ চূড়ান্ত করতে আরও আলোচনা প্রয়োজন।

সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা-

বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয়টি কিস্তিতে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া। তবে ঋণের পরিমাণ, কিস্তির সংখ্যা ও শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আইএমএফের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরের পর কর্মকর্তা পর্যায়ের আলোচনায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত এগোতে পারে। এরপর ঋণ কর্মসূচির জন্য আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফলে প্রস্তাবিত ঋণকে এখনই নিশ্চিত অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।

রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সংস্কারের চাপ-

নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সংস্কার। আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন-চন্দ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার। এ পরিস্থিতিতে সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং করব্যবস্থার কার্যকারিতা উন্নত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার না হলে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। নতুন কর্মসূচির আওতায় কী ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে, তা পরবর্তী আলোচনায় নির্ধারিত হওয়ার কথা।

সংস্কার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার-

সরকার সব সংস্কার একসঙ্গে কার্যকর করার পরিবর্তে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পক্ষে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইএমএফের কিছু পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সরকার একমত এবং কয়েকটি বিষয় ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, একদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানো ও ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সংস্কারের সময়সূচি ও বাস্তবায়নপদ্ধতি নির্ধারণে এই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বাংলাদেশের প্রকৃত প্রাপ্তি কোথায়?

ব্যাংককের সভা থেকে বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রাপ্তি না থাকলেও নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগোনো এবং সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতবিনিময় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। নতুন ঋণ চুক্তি হলে তা বৈদেশিক অর্থায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অর্থনীতির ওপর চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে ঋণের শর্ত, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতির ওপর।

সব মিলিয়ে আইএমএফের কাছ থেকে বাংলাদেশের এবারের প্রাপ্তি মূলত নতুন ঋণের আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, সংস্কার বিষয়ে মতবিনিময় এবং ভবিষ্যৎ অর্থায়নের পথ তৈরি করা। এখন দেখার বিষয়, এসব আলোচনা কত দ্রুত চূড়ান্ত চুক্তি ও বাস্তব অর্থপ্রবাহে রূপ নেয়।

এএইচ/পিএস

Link copied!