• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২১, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

করোনা দুঃশ্চিনায় যা বলছেন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা


নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ৬, ২০২০, ১২:০২ পিএম
করোনা দুঃশ্চিনায় যা বলছেন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা

ঢাকা: বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রথম ধাপ হলো শ্রেণীকক্ষে অনুপস্থিতি। আর ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। করোনার ছুটিতে একদিকে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে শ্রেণীকক্ষের বাইরে থাকছে, অন্যদিকে কাজের সুযোগ না থাকায় আয় বন্ধ হয়েছে হাজারো পরিবারের। তাই করোনার এ দীর্ঘ ছুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত ১৬ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। করোনা পরিস্থিতি অবনতির কারণে এ ছুটি আরো দীর্ঘ হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটি ঈদ পর্যন্ত গড়ালে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুই মাসেরও বেশি সময় শ্রেণীকক্ষের বাইরে থাকবে।

তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়িয়ে দেবে আর্থিক দুরবস্থা। তারা বলছেন, সাধারণত বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ পরিবারের আর্থিক দৈন্যের জন্য ছেলেমেয়েদের কাজে পাঠিয়ে দেন মা-বাবা। করোনার এ মহামারী পরিবারগুলোর সে দৈন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘ ছুটির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যালয়বিমুখতা তৈরি হবে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ না নিলে এ বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেড়ে যেতে পারে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, আসলে বর্তমানে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এত কথা বলছি যে শিক্ষা খাত নিয়ে তেমন ভাবার সুযোগ পাচ্ছি না। তবে করোনা মহামারী বৈশ্বিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে বড় হুমকিতে ফেলেছে। আমাদের মতো দেশে ঝুঁকি আরো বেশি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, গত কয়েক বছরে দেশের শিক্ষা খাতে বেশ উন্নতি হয়েছে। এ সংকট উন্নয়নের গতিকে স্থবির করে দিয়েছে। মোটাদাগে প্রভাবটা পড়বে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে। পরিবারের জীবন-জীবিকার তাগিদে সন্তানকে কাজে পাঠাবেন মা-বাবা। এজন্য দেশে শিশুশ্রমও বেড়ে যাবে। এর সঙ্গে বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির বিষয়টিও প্রভাব ফেলবে। এমনিতে শিক্ষাপঞ্জির যেকোনো বড় ছুটির পরও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি কিছুটা কম থাকে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন: অ্যানুয়াল সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট ২০১৯’ (এএসপিআর) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের ১৮ দশমিক ৬ শতাংশই পঞ্চম শ্রেণী শেষ করার আগে ঝরে পড়ে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার প্রথম শ্রেণীতে ১ দশমিক ৯ শতাংশ, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ২ দশমিক ৭, তৃতীয় শ্রেণীতে ৩ দশমিক ৪, চতুর্থ শ্রেণীতে ৮ দশমিক ৪ ও পঞ্চম শ্রেণীতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

করোনার এ বন্ধে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা করছেন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও। এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক শাহ বলেন, আমাদের এ উপজেলায় এমনিতেই আর্থিক সংকটের কারণে পরিবারগুলো তাদের সন্তানকে ইটভাটাসহ বিভিন্ন কাজে পাঠায়। করোনার এ সংকটে এখানকার জনগোষ্ঠীর অভাব আরো বেড়েছে। এজন্য তারা সন্তানদের বাধ্য হয়েই কাজে পাঠাবেন। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ কাউন্সেলিং করার চেষ্টা করছি। শিক্ষকদেরও পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

তবে করোনার ছুটিতে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফসি উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় আমরা টেলিভিশনের মাধ্যমে ক্লাস প্রচার শুরু করতে যাচ্ছি। এছাড়া শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের মাধ্যমে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এ সংকট শেষ হলে আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনব।

গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি মাধ্যমিকে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশিতব্য শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৩ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৫৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। মাধ্যমিকে এসব শিক্ষার্থীর ৩৬ দশমিক ৭৩ শতাংশই দশম শ্রেণী শেষ করার আগে ঝরে পড়ে।

ওই প্রতিবেদনে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সংস্থাটি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণও নির্ণয়ের চেষ্টা করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে আটটি কারণ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে পরিবার অন্যত্র চলে যাওয়া, বই-খাতাসহ লেখাপড়ার উপকরণ নষ্ট হয়ে যাওয়া, তাত্ক্ষণিকভাবে স্কুলের ব্যয় বহনে অক্ষমতা, মা-বাবাকে গৃহস্থালি কাজে সহায়তা, উপার্জনে বা ভাগ্যান্বেষণে নেমে পড়া, লেখাপড়ায় আর আগ্রহ না পাওয়া, স্কুলে যেতে নিরাপদ বোধ না করা, যাতায়াতে যানবাহন সংকট-সমস্যা।

ঝরে পড়ার কারণ বিষয়ে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ছেলে ও মেয়েদের স্কুল ছেড়ে দেয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ মা-বাবাকে ঘরের বা সংসারের কাজে সহায়তা দেয়া। ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৭ দশমিক ১৫ আর মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশই মা-বাবাকে ঘরের বা আয়-উপার্জনের কাজে সহায়তার কারণে স্কুল আসে না। স্কুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরের সবচেয়ে বড় বাধা দুর্যোগ-পরবর্তী যানবাহনের সংকট। ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ ছেলে ও ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ মেয়ে এ কারণে স্কুলে যায় না। উভয়ের ক্ষেত্রে স্কুলে না যাওয়ার তৃতীয় কারণ হচ্ছে লেখাপড়ায় আগ্রহ না থাকা। ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশ ছেলে ও ১১ দশমিক ২২ শতাংশ মেয়ে এ কারণে স্কুলে যায় না।

সোনালীনিউজ/টিআই

Haque Milk Chocolate Digestive Biscuit
Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System