• ঢাকা
  • বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

দেশে ফিরতে হাসিনার সামনে যে জটিল বাধা


নিউজ ডেস্ক জুন ৩, ২০২৬, ০৯:২৮ এএম
দেশে ফিরতে হাসিনার সামনে যে জটিল বাধা

গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সপ্তাহ ধরে নতুন করে আলোচনা-জল্পনা চলছে। বিভিন্ন পোস্ট, ভিডিও ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, তিনি শিগগির দেশে ফিরতে পারেন। অন্যদিকে, সরকার বলছে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে চলমান মামলাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বা ফেরানোর বাস্তবতা কতটুকু? থাকলে তা কীভাবে? আর না থাকলে প্রধান বাধাগুলো কোথায়?

বিষয়টি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কিংবা একজন পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করানোর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক আইন, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। ফলে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ফেরা বা ফেরানোর প্রশ্নটি এখন একটি বহুমাত্রিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

কূটনৈতিক সমঝোতা: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ভারতের কাছে কূটনৈতিক পত্র পাঠায়, যদিও ভারত এর জবাব দেয়নি। কিন্তু দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নোট ভারবাল পাঠায়। এতে হাসিনাকে ‘ফেরত পাঠানোর’ জন্য অনুরোধ করা হয় বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য। ২০১৩ সালের দ্বিপক্ষীয় এক্সট্রাডিশন চুক্তির আওতায় তা করা হয়, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আসামি ফেরত পাঠানোর বাধ্যবাধকতা আছে এ চুক্তিতে। তবে চুক্তিতে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ এর বিষয়ে অভিযোগ থাকলে তা বিবেচনা করে সে দেশ অপরাধীকে পাঠাবে কি পাঠাবে না, তা সে দেশ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই ভারত এটিকে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখে অনুরোধ প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের জন্য এটি একটি কূটনৈতিক দ্বিধা। কারণ, হাসিনাকে ফেরত পাঠালে বাংলাদেশে অস্থিরতা বাড়তে পারে।

তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ভারতে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফর হলে এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। মূলত কূটনৈতিক সমঝোতা বলতে বোঝায়, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আপস। বাংলাদেশ চায় ন্যায়বিচার। ভারত চায় স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা। তাই এ নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিছুটা বাণিজ্যিক, কিছুটা রাজনৈতিক কারণে এ ধরনের নানা গুঞ্জন প্রচার করে থাকে। তবে শেখ হাসিনার ফেরা নির্ভর করছে তার এবং তার দলের ইচ্ছা ও অবস্থানের ওপর। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাজনীতির নানা ধরনের দেশি-বিদেশি খেলোয়াড় এবং তাদের লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ।

গুঞ্জনের উৎস কোথায়: দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসছে। তার অবস্থান, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা কিংবা ফিরে আসা নিয়ে চলছে আলোচনা। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অথবা কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমে তার ফেরার পথ তৈরি হচ্ছে। এমনকি এ-সম্পর্কিত বার্তাও প্রচার বা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির সপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নেতিবাচক এবং ইতিবাচক হিসেবে শেখ হাসিনাকে ঘিরে কৌতূহলের কারণে সামান্য তথ্যও দ্রুত গুঞ্জনে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ছয় দিন আগে ‘দি ওয়াল.ইন’ নামের একটি অনলাইন পোর্টালে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার সংযুক্ত একটি পোস্ট করা হয়। সেখানে শেখ হাসিনা বলে দাবি করা হয়েছে—‘আমি বলতে পারি, আমি কখন কীভাবে দেশে ফিরব, সে সিদ্ধান্ত একান্তই আমার। আমার শক্তি বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের ভালোবাসা। জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব। কোনো অবৈধ রায় কিংবা কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আমাকে রুখতে পারবে না।’ গত ৩০ মের এক পোস্টে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি শিগগির দেশে ফিরে আসবেন। মাথা উঁচু করে বীরের বেশে।

আইনে কী আছে: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পলাতক অপরাধী বিনিময়ের আইনি ভিত্তি হলো বাংলাদেশের ‘বন্দি প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৭৪’ এবং ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ‘ভারত-বাংলাদেশ বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি’। এই আইনি কাঠামোর অধীনে উভয় দেশ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিদের নিজেদের দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে। ১৯৭৪ সালের আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে যে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রকে এই আইনের আওতাভুক্ত করতে পারে। ১৫ ধারা অনুযায়ী, বিদেশে পলাতক কোনো অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে আবেদন করতে পারে। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০১৬ সালে এটি সংশোধিত হয়। চুক্তির আওতায়, যেসব অপরাধের সাজা কমপক্ষে এক বছর বা তার বেশি, শুধু সেসব অপরাধের ক্ষেত্রেই প্রত্যর্পণ কার্যকর করা যায়। প্রত্যর্পণ না করার শর্তাবলির মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অপরাধ; অর্থাৎ কোনো অপরাধকে যদি ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ বলে বিবেচনা করা হয়, তবে অভিযুক্তকে প্রত্যর্পণ করা যায় না। তবে হত্যা, অপহরণ এবং নাশকতার মতো গুরুতর অপরাধগুলোকে রাজনৈতিক হিসেবে গণ্য করা হয় না। চুক্তি অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র তার নিজের দেশের নাগরিককে অন্য কোনো দেশের হাতে তুলে দিতে বাধ্য নয়। এ ছাড়া ন্যায়বিচারের স্বার্থে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে বা প্রমাণাদির অভাবে অনুরোধকারী রাষ্ট্র যদি প্রত্যর্পণের আবেদন খারিজ করতে চায়, তবে তা করতে পারে।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর ব্যাপারে আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, এটা তো সম্পূর্ণ নির্ভর করবে ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। তা ছাড়া অতীতে যখন কোনো সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান অন্য কোনো দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, তখন তাদের ফেরানোর দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। ভারতের সঙ্গে হাসিনার যে সম্পর্ক; ’৭৫-এর পরও তো ৬ বছর সেখানে ছিল। সম্পর্কের কারণে ভারত তাকে ফিরিয়ে দেবে বলে আমি মনে করি না। তারপর বিশেষত যখন যে দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করে ওই দেশ যদি মনে করে, স্বদেশে তার ন্যায়বিচার হয় নাই, তখন ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। এক প্রশ্নের জবাবে ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, যদি ধরেও নেওয়া হয়, কোনোভাবে দেশে ফিরল তারপর যেহেতু তার মৃত্যুদণ্ড হয়ে আছে, তাকে সরাসরি কারাগারে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে বিএনপির নেতাদের অনুপস্থিতিতে তো বিচার হয়ে সাজা হলো। তারপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফিরে এসে তাদের সব সাজা মওকুফ হয়ে গেল। ওইরকম হলে অন্য কথা। তবে সেই ধরনের পটপরিবর্তন সহসা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সরকারের অবস্থান: বর্তমান সরকারের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম চলছে, সেগুলোর আলোকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ সরকারের অবস্থান রাজনৈতিক নয়, বরং আইনি কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের মতে, কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা থাকলে এবং আদালত প্রয়োজন মনে করলে তাকে বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে আইনি দাবি উত্থাপন করলেই যে প্রত্যর্পণ নিশ্চিত হবে, বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক) হুমায়ুন কবির বলেন, শেখ হাসিনাকে একজন পালিয়ে যাওয়া সন্ত্রাসী হিসেবে ‘জুডিসিয়াল প্রসেসে’র (বিচারিক প্রক্রিয়া) মাধ্যমে দেশে ফেরানো হবে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিচার নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে সরকার ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অব্যাহতভাবে কথা বলছে।

প্রত্যর্পণ কেন গুরুত্বপূর্ণ: কোনো ব্যক্তি যদি এক দেশে অবস্থান করেন কিন্তু অন্য দেশে তার বিরুদ্ধে মামলা বা দণ্ড কার্যকরের প্রয়োজন হয়, তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশন বলা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির ভিত্তিতে উভয় দেশ নির্দিষ্ট শর্তে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একে অপরের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। তবে একটি দেশ অনুরোধ করলেই অন্য দেশ বাধ্যতামূলকভাবে কাউকে ফিরিয়ে দেবে এমন কোনো নিয়ম নেই। অনুরোধ গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট দেশ বিভিন্ন আইনি, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয় পর্যালোচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

জটিলতা কোথায়: শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে জটিলতার প্রথম কারণ তার রাজনৈতিক পরিচয়। তিনি শুধু একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন; তিনি দীর্ঘ সময় সরকারপ্রধান ছিলেন এবং দেশের প্রাচীন দলের রাজনৈতিক দলের নেতা। যদিও তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। কূটনীতিকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্ব পায়। প্রথমত, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ফৌজদারি নাকি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটসম্পন্ন? দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দেশে ফিরে ন্যায়বিচার পাবেন কি না? তৃতীয়ত, তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। চতুর্থত, বিচারিক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সন্তোষজনক না হলে অনেক দেশ প্রত্যর্পণের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে বা সময়ক্ষেপণ করে থাকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরত চায়, যেন তিনি বাংলাদেশে মামলার মুখোমুখি হন। গত ২১ মে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া শেখ হাসিনা সম্প্রতি কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি শিগগির দেশে ফিরে আসার কথা বলেছেন। এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমরা তো তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হয়েছে, যেন তিনি বাংলাদেশে মামলার মুখোমুখি হন।’

শেখ হাসিনা কি স্বেচ্ছায় ফিরবেন: আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে আরেকটি আলোচনা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা। তাত্ত্বিকভাবে যে কোনো নাগরিক নিজের দেশে ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি নির্ভর করে দেশে ফেরার পর কী ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে তার ওপর। যদি দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার, বিচারিক হেফাজত বা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে স্বেচ্ছায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত তিনি নাও নিতে পারেন। অন্যদিকে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা, আইনি নিশ্চয়তা বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ভিন্নও হতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমানে এমন কোনো দৃশ্যমান ইঙ্গিত পাওয়া যায় না, যা থেকে তার স্বেচ্ছায় ফেরার ইঙ্গিত দেখা যায়।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চান। তিনি অতীতেও মাথা উঁচু করে দেশে ফিরেছেন। সব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফেরেন। আবার ২০০৭ সালের মে মাসে তিনি সেনাসমর্থিত সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফেরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে জাতির কাছে এ বিষয়টি পরিষ্কার যে, জুলাই আন্দোলন কোনো আন্দোলন নয়, এটা সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত। ড. ইউনূস দেশ ও দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন। তবে তিনি কবে, কখন ফিরবেন এটা সময়ই বলে দেবে।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধান বা সাবেক সরকারপ্রধানদের প্রত্যর্পণ নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের উদাহরণ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া বছরের পর বছর স্থায়ী হয়েছে। আবার অনেক সময় রাজনৈতিক আশ্রয়, মানবাধিকার-সংক্রান্ত উদ্বেগ কিংবা কূটনৈতিক বিবেচনার কারণে প্রত্যর্পণ কার্যকর হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিদেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছেন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কেবল আইনি নথিপত্রের ওপর নির্ভর করবে না; রাজনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখবে।

দেশে ফেরার বাস্তবতা কতটা: বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথমত, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরাতে আগ্রহী বলে প্রকাশ্যে জানিয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় আইনি কাঠামো বিদ্যমান। তৃতীয়ত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থত, রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যর্পণ সাধারণ অপরাধমূলক মামলার তুলনায় অনেক বেশি জটিল। পঞ্চমত, এখন পর্যন্ত এমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি, যা থেকে বলা যায় যে, খুব শিগগির প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত বলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সম্পূর্ণ অসম্ভব বলাও বাস্তবসম্মত হবে না।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ও জল্পনা থাকলেও বাস্তবতা হলো, বিষয়টি এখনো আইন, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনার জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরাতে আগ্রহী, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে ভারতের সিদ্ধান্তও হবে বহুমাত্রিক বিবেচনার ফল। ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা শুধু একটি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি দুই দেশের সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক রাজনীতির বৃহত্তর সমীকরণের অংশ।

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা শাকিল আকন্দ বুলবুলের কথিত একটি টেলিফোন কথোপকথন প্রকাশের পর ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ওই কথোপকথনের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা, মামলার বাদী, সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে।

শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং শাকিল আকন্দ বুলবুলকে দুই মাসের কারাদণ্ড দেন। ট্রাইব্যুনাল জানান, আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তারের দিন থেকে সাজা কার্যকর হবে।

২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম মামলা দায়ের হয়। পরে তদন্ত শেষে শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করা হয়।

মামলায় পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক থাকায় তাদের আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তারের পর সাজা কার্যকর হবে।

পলাতক অবস্থায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাজার রায় ঘোষণা হয়েছে। সে কারণে তিনি ওইসব রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ হারিয়েছেন। সাজার বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তাকে আগে আত্মসমর্পণ করতে হবে বলে জানান আইনজীবীরা। সূত্র: কালবেলা

এম

Link copied!