ফাইল ছবি
বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি ও নানাবিধ স্বাস্থ্য জটিলতায় আকস্মিক ও অকালমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটছে অসংক্রামক রোগের কারণে, যার একটি বড় অংশ ঘটে ৭০ বছর বয়সের আগেই। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে আকস্মিক ও অকালমৃত্যুর পেছনে পাঁচটি প্রধান শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কারণ কাজ করছে।
১. হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাক
কম বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ, বিশেষ করে করোনারি আর্টারি ডিজিজ ও হার্ট অ্যাটাক। স্বাভাবিক অবস্থায় আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষের মধ্যেও হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। হার্টে পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে এই সংকট তৈরি হয়। বুকের মাঝখানে তীব্র চাপ ও ব্যথা, যা ধীরে ধীরে ঘাড়, পিঠ, চোয়াল বা বাম হাতে ছড়িয়ে পড়ে—তা হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণ। অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ না রাখা এবং তামাক ব্যবহারের ফলে কম বয়সীদের মধ্যেও এই ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
২. স্ট্রোক ও মস্তিষ্কের রক্তনালীর জটিলতা
হৃদরোগের পর আকস্মিক মৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ স্ট্রোক। স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত ঘটায়। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বা রক্তনালী ছিঁড়ে কোষগুলো মরে গেলে স্ট্রোক হয়। যদিও একসময় এটি মূলত প্রবীণদের রোগ হিসেবে বিবেচিত হতো, ইদানীং তরুণদের মধ্যেও এর প্রকোপ বাড়ছে। আচমকা হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে আসা, দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া কিংবা হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা না পেলে রোগীর অকালমৃত্যু ঘটতে পারে।
৩. নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ডায়াবেটিস
বাংলাদেশে অনিয়ন্ত্রিত ও অজ্ঞাত ডায়াবেটিসের প্রকোপ অল্প বয়সে নানা জটিলতা ও অকালমৃত্যুর অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্যমতে, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের একটি বিশাল অংশই জানেন না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অল্প বয়স থেকেই প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, স্থূলতা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবের কারণে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস নিরবে শরীরের হার্ট, কিডনি ও রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
৪. দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ
ফুসফুসজনিত দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যেমন ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও চরম অ্যাজমা বা হাঁপানি কম বয়সে মৃত্যুর আরেকটি অন্যতম কারণ। বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ধূমপান এবং রান্নার কাজে অস্বাস্থ্যকর জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ফুসফুসের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর একটি বড় অংশ ঘটে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের ব্যাধির কারণে। অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় না হওয়ায় শ্বাসকষ্ট তীব্র রূপ নিয়ে আকস্মিক প্রাণহানি ঘটায়।
৫. অনিয়ন্ত্রিত ক্যান্সার ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
অল্প বয়সে অকালমৃত্যুর পঞ্চম বড় কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা অনিয়ন্ত্রিত ক্যান্সার এবং চরম মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে ফুসফুস, মুখগহ্বর, পাকস্থলী ও নারীদের স্তন বা জরায়ুমুখের ক্যান্সার সময়মতো ধরা না পড়ায় মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। পাশাপাশি, বিষণ্নতা ও তীব্র মানসিক চাপ কম বয়সীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আকস্মিক মৃত্যু কিংবা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, বায়ুদূষণ ও ধূমপান পরিহার, নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তের শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা এবং যেকোনো প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেওয়া মাত্রই জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এসএইচ







































