ফাইল ছবি
ঢাকা: ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মকান্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরী হচ্ছে। একই ধরণের ঘটনার অভিযোগে দুই ধরণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে রির্টানিং অফিসাররা। নিজেদের পদোন্নতি ও গুরুত্বপুর্ণ জায়গায় পদায়ন নিশ্চিত করতে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের আস্থায় আসতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন কেউ কেউ। দলীয় আনুগত্যে প্রমাণ করতে অফিসার্স ক্লাব ছাড়াও একটি রাজনৈতিক দলের অফিসেও যাতায়াত করছেন। সেখানে বসে দলটির মনোনিত প্রার্থীদের ভোটে জেতাতে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নানাভাবে প্রভাবিত করছেন তারা। অতি উৎসাহী এসকল কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই স্বৈরাচারী আওয়ামীলীগ সরকারের সুবিধাভোগী। এছাড়াও দলটির ছাত্রসংগঠন করতেন অথবা চাকুরী জীবনে সুবিধাভোগী ছিলেন এমন কর্মকর্তারও রয়েছেন। এতে চরমভাবে বিব্রত পেশাদার কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৩ আসনে (উলিপুর) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলমের (সালেহী) মনোনয়নপত্র বাতিল করে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণ দেবনাথ। একই ধরনের ঘটনায় দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের কোন ডুকুমেন্টস সাবমিট করা ছাড়াই মনোনয়ন পত্রের বৈধতা দেওয়া হয় ফেনী-৩ আসনের বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আওয়াল মিন্টুর।
আদালত অবমাননার একটি অভিযোগে কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণার পর ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে হাততালি দেয়। একই অভিযোগে গাইবান্ধা ১ আসনে জমায়াতের প্রার্থী মাজেদুর রহমান প্রথমে মনোয়নপত্র বাতিল হয়। পরে পূনরায় শুনানি ও রিভিউ করে প্রার্থীতা বৈধ ঘোষণা করে রিটার্নেং অফিসার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ‘পলাতক’ আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ একে একরামুজ্জামান সুখনের নামে দাখিল করা মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। হলফনামায় তিনি ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর একরামুরজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানা, নাসিরনগর, যাত্রাবাড়ী এবং উত্তরা-পূর্ব ও পশ্চিম থানায় দায়ের হওয়া ৭টি মামলা তদন্তাধীন বলে উল্লেখ করেছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসে মাঠ প্রশাসন যারা নিয়ন্ত্রণ করছেন তাদের বেশিরভাগই একটি রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুইয়ার একান্ত সচিব ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব সাইফুল্লাহ পান্না ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর একান্ত সচিব। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর অনুরোধেই তাকে এই পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় বলে জানা যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নাসিমুল গণি ছিলেন বিএনপি আমলে স্পিকার জমির উদ্দীন সরকার এর একান্ত সচিব। বিএনপি কোটায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহসানুল হক দলটির চেয়ারপার্সনের একান্ত সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারের ঘনিষ্টজন। বিএনপির শাসনামলে এই কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বিএনপি সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ছিলেন। বিএনপির সুপারিশেই তাকে নির্বাচন কমিশনে সিনিয়র সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। বিএনপির শাসনামলে এই কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (রাজনৈতিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব আলী নেওয়াজ বিএনপির সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। বিএনপির শাসনামলে তিনি কেরানিগঞ্জের এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে মাঠ প্রশাসনে পছন্দের লোক বসাতে কাজ শুরু করে দলটির আস্থাভাজন কর্মকর্তারা। এসময় জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ের অতিরিক্ত সচিবকে সরিয়ে পদোন্নতি পদায়নের নিয়ন্ত্রণ নেয় যুগ্মসচিব মিঞা আশরাফ রেজা ফরিদী।
কারাগারে থাকা স্বাস্থ্যসচিব জাহাঙ্গীর হোসেনের ঘনিষ্টভাজন হয়ে দীর্ঘদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করা মিঞা আশরাফ রেজা ফরিদী ৫ আগস্টের পরে ভোল পাল্টিয়ে ৮২ ব্যাচের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার ঘনিষ্ট হয়ে যান। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজ শ্যালক এবং ব্যাচমেট তার শ্যালক ও ব্যাচমেট আবু নঈম মোহাম্মদ মারুফ খান নরসিংদীর ডিসি ও ফ্যাসিস্টের সচিব এবং সাবেক এমপি এম সাজ্জাদুল হাসান এবং মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার একান্ত সচিব হওয়া সত্বেও পরিবেশ উপদেষ্টার একান্ত সচিব হিসাবে বহাল তবিয়তে আছেন। দুলা ভাই অতিরিক্ত সচিব মো: আতাউর রহমান খান আছেন স্বরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে।
নিজের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের ভোটের আগে জেলা প্রশাসক (ডিসি), ইউএনও এবং এডিসি হিসেবে পদায়ন নিয়ে লেজেগোবরে পাকিয়ে ফেলে এই কর্মকর্তা। ২৯ জেলায় যে ডিসি দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে বেশির ভাগ আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। পদায়নের পর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক জেলা প্রশাসকের পদায়ন বাতিল করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পদায়নের পরিপত্র লঙ্ঘন করে পদায়ন করা হয়। ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় পদায়ন হওয়া ২৯ জনের মধ্যে ১৫ জনই সচিবালয়সহ ঢাকার মধ্যে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়াও ঢাকার আশপাশে লোভনীয় অনেক উপজেলায় পদায়ন করা হয়নি। আর লোভনীয় উপজেলাগুলো থেকে উঠিয়ে আনা কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে। এডিসি পদায়নেও আওয়ামী সুবিধাভোগী এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে পদায়ন করা হয়।
পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়ন করার পর এসকল কর্মকর্তাদের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিতে সহযোগীতা চাওয়ার অভিযোগ উঠছে। অফিসার্স ক্লাবে বসে প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ফোন করে এই সহযোগীতা চাওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, সিনিয়র স্যাররা আগামি দিনে ক্ষমতায় আসবে এমন একটি দলের প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। কোন সহযোগীতা লাগলে দিতে বলছেন। দল ক্ষমতায় যাওয়ার পর এটি মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।
জুলাই অভ্যত্থানের পরই ভোল পাল্টাতে শুরু করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এতে হতাশা প্রকাশ করে গত বছরের আগস্টে ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও আগামী দিনের জনপ্রশাসন’ শীর্ষক সেমিনারটি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা বিএনপি চেয়ারপার্সনের একান্ত সচিব আব্দুস সাত্তার বলেছিলেন, ‘আমি একটি রাজনৈতিক দলের অফিসে বসি। গত বছর ৫ আগস্টের পর ওই অফিসে হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ভিড় করছেন। আমার বস তারেক রহমান ডেকে বললেন, “কী হচ্ছে? এরা কারা। তাঁরা এখানে কী জন্য আসে।” আমি বলেছি, এরা সবাই বঞ্চিত। এরা গত ১৫ বছর হাসিনার আমলে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। হাসিনার পতনের পর উচ্ছ্বাসে ছুটে এসেছেন ন্যায়বিচার পেতে। উনি বলেছেন, “দলীয় অফিসে ইন-সার্ভিস কর্মকর্তারা আসা ভালো লক্ষণ নয়। আপনি তাদের অফিসে আসতে নিষেধ করে দেন।” আমি অফিসের গেটে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছি। ইন-সার্ভিস কোনো কর্মকর্তা অফিসে আসতে পারবেন না। যদি কোনো সমস্যা থাকে অফিসার্স ক্লাবে আসবেন।’
জানতে চাইলে অবসরপ্রাপ্ত বিসিএস অফিসার্স ফোরামের সদস্যসচিব ও সাবেক সচিব প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শরিফুল আলম বলেন, বেশ কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রার্থিতা বাছাইসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বেশ কিছু প্রার্থী সংক্ষুব্ধ হয়েছেন। অনেকে দাবি করছেন রিটার্নিং অফিসাররা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারছেন না। প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারালে প্রভাবশালী দল এবং তাদের প্রার্থীগণ প্রশাসনকে সহজে প্রভাবিত করবে। অতীতে আমরা এটি বিভিন্ন নির্বাচনে দেখেছি। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যে কারো বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ উত্থাপন হলে তদন্ত সাপেক্ষে সাথে সাথে তাকে তার কর্মস্থলে থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাজ থেকে বিরত করতে হবে। পরবর্তীতে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রমোশনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। অভিযুক্তদের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশন অফিস, বিভাগীয় কমিশনার অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ‘অভিযোগ বক্স’ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
পিএস







































