আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ধারাবাহিক অভিযোগে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ তুলছে জোটের শরিক দলগুলো। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে- শেষ পর্যন্ত কি নির্বাচন বর্জনের পথে হাঁটতে পারে এই জোট?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ-উর রহমান মনে করেন, নির্বাচন বর্জনের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যদিও এটি এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পেরিয়ে প্রতীক বরাদ্দ হলেও কোনো রাজনৈতিক জোট চাইলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে পারে। অতীতে এমন উদাহরণ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সম্প্রতি জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন কার্যত বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মো. তাহের সাংবাদিকদের বলেন, কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলছেন—তারেক রহমানকে ক্ষমতায় বসানোই যেন এখন মূল লক্ষ্য।
জাহেদ-উর রহমানের মতে, এসব অভিযোগের পেছনে দুই ধরনের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একদিকে এটি প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে, ভবিষ্যতে নির্বাচন বর্জনের যুক্তি তৈরির প্রস্তুতিও হতে পারে। তাঁর ভাষায়, “যদি ধারাবাহিকভাবে বলা হয় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, তাহলে একপর্যায়ে বলা সহজ হয়ে যায়—এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো অর্থ নেই।”
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনী পরিবেশ অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ভারসাম্যহীন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনগুলো তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও এবার অনেক আগেই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে বিএনপি বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। তাঁর মতে, “কোনো নির্বাচনেই আগেভাগে এতটা নিশ্চিতভাবে বিজয়ী পক্ষ অনুমান করা যায়নি।”
এই বিশ্লেষকের আশঙ্কা, এমন নিশ্চিত বিজয়ের ধারণা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গণমাধ্যমের একটি অংশকে ‘সূর্যমুখী প্রবণতা’র দিকে ঠেলে দিতে পারে। অর্থাৎ সম্ভাব্য ক্ষমতাকেন্দ্রের দিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
জামায়াত-এনসিপি জোটের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পাওয়া। জাহেদ-উর রহমান বলেন, যদি তারা বুঝতে পারে যে এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ আসনের কাছাকাছিও তারা যাচ্ছে না, তাহলে সংসদের ভেতরে বা বাইরে কার্যকর বিরোধী রাজনীতি করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এতে দলের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সমর্থকদের মনোবলে বড় ধাক্কা আসতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন বর্জনের হুমকি একটি ‘আলটিমেট বার্গেইনিং টুল’ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিলে দেশ অজানা পথে এগিয়ে যেতে পারে, যার পরিণতি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে।
জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জাহেদ-উর রহমান বলেন, এতে নির্বাচন পুরোপুরি একতরফা বলে চিহ্নিত করা কঠিন হবে, যদিও একে পূর্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনও বলা যাবে না। তবু জাতীয় পার্টির উপস্থিতি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা হলেও বাড়ায়।
সবশেষে তিনি আহ্বান জানান, সম্ভাব্য রাজনৈতিক ফলাফল অনুকূলে না আসার আশঙ্কায় যেন কোনো দল নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ায়। তাঁর মতে, বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন সব সময়ই ছিল—এমনকি তুলনামূলক ভালো নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রেও। সেই বাস্তবতা মেনেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়াই দেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ। সূত্র: ইনকিলাব
এম







































