ফাইল ছবি
নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে নতুন পে স্কেল ঘোষণা এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আড্ডায় প্রধান অনুষঙ্গ। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এটি এখন জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের গুঞ্জন শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই খাতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বরাদ্দের জল্পনা থাকলেও ফাইল যেন কিছুতেই এগোচ্ছে না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পে স্কেল থমকে যাওয়ার পেছনে কেবল সরকারের অর্থ সংকটই একমাত্র কারণ নয়, বরং কর্মচারীদের ভেতরের গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট ও বিভেদই এর জন্য বড় দায়ী।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। এক দপ্তর যখন দাবি নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে, অন্য দপ্তর তখন নীরব ভূমিকা পালন করছে। এই বিচ্ছিন্নতা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অত্যন্ত দুর্বল বার্তা দিচ্ছে। এর বাইরে কর্মচারীদের নিজেদের মধ্যেই বড় ধরনের মতভেদ রয়েছে। গ্রেড বৈষম্য দূর করা নাকি সরাসরি মূল বেতন বৃদ্ধি-কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, তা নিয়ে তারা একমতে পৌঁছাতে পারছেন না। এই অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের সুযোগটিই প্রশাসন কাজে লাগাচ্ছে বলে মনে করছেন সাধারণ কর্মীরা।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দরকষাকষির জন্য কোনো শক্তিশালী একক প্ল্যাটফর্ম নেই। শত শত ছোট ছোট সমিতিতে বিভক্ত হওয়ায় সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য কোনো ‘কমন ভয়েস’ তৈরি হচ্ছে না। এর ওপর অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলনের নামে কিছু অসাধু সংগঠন তৈরি হয়েছে যারা মূলত ছদ্মবেশে সরকারের পক্ষ হয়ে কাজ করে। সাধারণ কর্মচারীদের দাবি আদায়ের মূল স্রোতকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এরা প্রশাসনের সঙ্গে লিয়াজোঁ বজায় রাখছে এবং আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
অধস্তন কর্মচারীদের দাবি আদায়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতার অভাব প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকায় নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তেমন কোনো প্রশাসনিক চাপ তৈরি করছেন না। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি এবং পে-স্কেল বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদের দ্বন্দ্বে। এই দুই শীর্ষ সংগঠন প্রায়ই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে। এক পক্ষ যখন রাজপথে নামার ডাক দিচ্ছে, অন্য পক্ষ তখন প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলছে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে। এই পাল্টাপাল্টি রশি টানাটানিতে সাধারণ কর্মচারীদের ভাগ্য সুতোয় ঝুলে গেছে।
দাবি আদায়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট দপ্তরগুলোতে যেভাবে নিয়মিত এবং পেশাদার উপায়ে যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন, তাতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ফাইল মুভমেন্টের তদারকিতেও কর্মচারীদের প্রতিনিধিদের পেশাদারিত্বের অভাব লক্ষ্য করা গেছে। ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজাল কেটে ফাইল ওপরের দিকে উঠতে পারছে না।
কেবল বাজেট বরাদ্দ বা সরকারের স্বদিচ্ছাই পে স্কেল পাসের জন্য যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের ভেতরের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ঘর শত্রু বিভীষণ কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত পে স্কেলের ফাইল লাল ফিতাতেই বন্দি থাকবে। এখন প্রশ্ন হলো, সাধারণ কর্মচারীরা কি পারবেন নিজেদের বিভেদ ভুলে এক ছাতার নিচে দাঁড়াতে, নাকি সমন্বয়হীনতার এই গোলকধাঁধায় আরও একটি বছর কেটে যাবে পুরনো বেতনেই? রাজপথের ক্ষোভ বলছে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সাধারণ কর্মচারীদের অপেক্ষা আর দীর্ঘ করার সময় এখন আর নেই।
এসএইচ







































