• ঢাকা
  • সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১, ৫ মাঘ ১৪২৭

এইডস ও আমাদের বাঁচামরার সংজ্ঞা


আবদুর রউফ ডিসেম্বর ১, ২০২০, ১১:৫২ এএম
এইডস ও আমাদের বাঁচামরার সংজ্ঞা

ঢাকা : বিশ্বের অন্য অন্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে ১ ডিসেম্বর  বাংলাদেশে বিশ্ব এইডস দিবস পালন করে আসছে। বিশ্বব্যাপী ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্ব এইডস দিবস পালন করা শুরু হয়। ঠিক তার পরের বছরে দেশে প্রথম এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়। বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হলো এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং প্রতিরোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বিশ্বে প্রায় সাড়ে চার কোটির বেশি মানুষ এই নীরবঘাতক জীবাণু নিয়ে বেঁচে আছে। অথচ এর মধ্য এক কোটির বেশি মানুষ জানেই না তার শরীরে নীরব ঘাতক ভাইরাসটি রয়েছে। উল্লেখ্য, এইডস একটি মাত্র রোগ নয়। এইডসের পূর্ণ নাম অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম, যার অর্থ ‘অর্জিত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির লক্ষণসমূহ’। এইচআইভি এমন এক ভাইরাস, যা মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। ফলে যে কোনো সামান্য রোগও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এইচআইভি ভাইরাস থেকে মূলত এইডস হয়।

এইডসের এখনো কর্যকর কোনো ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক  আবিষ্কার হয়নি। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার ফল হিসেবে এখন আর এইচআইভি ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়াটাকে মৃত্যুদণ্ডের শামিল বলে গণ্য করা হয় না। অ্যান্টি-রিট্রোভাইরাল ড্রাগস দিয়ে এইডস ভাইরাসকে বহুদিন আটকে রাখা যায়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি মোটামুটি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তবে বাস্তবতা এমন যে, রোগীর বহুমূল্যের ওষুধ কেনার সামর্থ্য থাকে না। তবে এই রোগপ্রতিরোধের অন্যতম উপায় সচেতনতা। বিষেজ্ঞগণের মতে, একমাত্র সচেতনতা ও জীবনযাপনে দায়িত্বশীল আচরণে এইডস প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষ করে মানুষ তার যৌন জীবনের ব্যাপারে একদম অসচেতন।

এইচআইভি সম্পর্কে আমাদের সমাজে নানা কান কথা প্রচলিত আছে। অনিয়ন্ত্রিত যৌনসঙ্গম ছাড়াও আর কোন উপায়ে একজন মানুষ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত  হতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের জানা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি এই রোগের কিছু লক্ষণ আছে যা মানবদেহে দেখা দিলে এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার সম্ভবনা আছে, সেই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। উকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৩ হাজার ৬৭৪ জন ব্যক্তি এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত; আর ঝুঁকিতে আছে আরো ১৪ হাজার ৩শ জন। সরকারি হিসাবের চাইতে সংখ্যাটা আরো বেশি বলে মতামত দিচ্ছেন গবেষকগণ।

এইডস এমন এক নীরবঘাতক যে, তার কোনো প্রকৃতপক্ষে  সুনির্দিষ্ট লক্ষণ নেই। দেশ, আবহাওয়া ও স্থানভেদে এইডসের লক্ষণের মধ্য তারতম্য  দেখা যায়। এইডসের কিছু সাধারণ লক্ষণ যেমন : দীর্ঘদিন জ্বর থাকা অথবা বার বার জ্বর হওয়া কিন্তু কী কারণে জ্বর হচ্ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে না পাওয়া, অতিরিক্ত অবসাদ, শরীরের ওজন দ্রুত হ্রাস পাওয়া, লিম্ফগ্রন্থি ফুলে উঠা, শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাড়ের জয়েন্টগুলো ফুলে থাকা, ঘন ঘন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া যেমন : যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, প্রস্রাবের প্রদাহ। এছাড়া দীর্ঘদিন ডায়রিয়ার সমস্যায় ভোগা যা স্বাভাবিক চিকিৎসায় কোনোক্রমেই ভালো হয় না, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, তীব্র মাথাব্যথা ইত্যাদি। তবে কারো মানবদেহে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই তার এইডস হয়েছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে সেই ব্যক্তি এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের আওতাভুক্ত। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলেই বিলম্ব না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এইচআইভি পরীক্ষা না করে কোনোভাবেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না যে এই লক্ষণওয়ালা ব্যক্তি এইডসে আক্রান্ত।

‘এইচআইভি কীভাবে ছড়ায় এবং কারা ঝুঁকিপূর্ণ’ এ বিষয়ে আমাদের সমাজে নানা রকম গুজব ছড়িয়ে আছে। তাই এই বিষয়ে আমাদের সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে অসচেতনতা, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, সুস্থ জীবনের অনুশীলনের অভ্যাস না করাটাই এ রোগের প্রধান ঝুঁকি বলে বিবেচনা করা হয়। তবে কিছু সুনির্দিষ্ট উপায়ে এইচআইভি ছড়াতে পারে। তা হলো-প্রথমত, এইচআইভি বা এইডস আক্রান্ত রোগীর রক্ত বা রক্তজাত পদার্থ অন্য কোনো ব্যক্তির দেহে পরিসঞ্চালন করলে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক ব্যবহূত টুথব্রাশ, সুচ, সিরিঞ্জ, ছুরি, ব্লেড বা ডাক্তারি কাঁচি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত না করে অন্য কোনো ব্যক্তি ব্যবহার করলে। তৃতীয়ত আক্রান্ত ব্যক্তির অঙ্গ অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করলে। চতুর্থত এইচআইভি বা এইডস আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে (গর্ভাবস্থায়, প্রসবকালে বা সন্তানের মায়ের দুধ পানকালে)। পঞ্চমত, অনৈতিক ও অনিরাপদ বা কনডম ছাড়া যৌন মিলন করলে। এছাড়া সমকামী, বহুগামী ব্যক্তি এবং বাণিজ্যিক ও ভাসমান যৌনকর্মীর সঙ্গে অরক্ষিত যৌনমিলনের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায়। সেই সাথে বর্তমান যুবসমাজের মধ্যে নেশার আধিক্য এবং একই সিরিঞ্জের মাধ্যমে বার-বার মাদকদ্রব্য গ্রহণ ও এইচআইভি আক্রান্ত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিবিড় ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ সীমান্ত এলাকা এবং এভাবেই বিভিন্ন দেশে আসা-যাওয়ায় উপরিউক্ত উপায়ে এইচআইভি ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। শ্রমিক অভিবাসন ও মানবপাচারের ফলে এইডস আক্রান্ত জনগণের দেশে গমনাগমন এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সর্বোপরি এইচআইভি সম্পর্কে জনসচেতনতা ও তথ্যের অভাবে রোগটি ছড়ানোর বিশেষভাবে ঝুঁকি থাকে।

মনে রাখতে হবে, কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করেও এ ভাইরাস শরীরে বাসা বেঁধে বছরের পর বছর সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। ভাইরাসটি এসময় অন্যকেও সংক্রমিত করতে পারে। কারো শরীরে এইচআইভি আছে কি-না তা বাইরে থেকে অনেক সময় বোঝার কোনো উপায় থাকে না। যদি কারো সন্দেহ হয় তাহলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এ ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। তাই দেখা যায়, অনেকে নিজের অজান্তেই এ ভাইরাস বহন করে চলেছেন এবং অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

এইডসের বিস্তার নিয়ে আমাদের সমাজে বিভ্রান্তি রয়েছে। এই ভাইরাস বিস্তারে যেসব বিষয়ে বিভ্রান্তি যেসব ক্ষেত্রে এইচআইভি ছড়ানোর সম্ভাবনা একেবারেই নেই, তা হলো বায়ু, পানি, খাদ্য, মশা, মাছি বা পোকামাকড়ের কামড়ে এইচআইভি ছড়ায় না। এইডস রোগীর ছোঁয়ায় বা স্পর্শে, হাঁচি, কাশি, থুতু বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে, করমর্দন, একই ঘরে বসবাস, চলাফেরা ও খেলাধুলা করলে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহূত পায়খানা, বাথরুম, বেসিন, থালাবাসন, গ্লাস, বিছানা, বালিশ ইত্যাদি ব্যবহার করলেও এইচআইভি ছড়ানোর সম্ভবনা নেই। এইডস রোগীর চিকিৎসায় কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরাও ঝুঁকিমুক্ত। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্য রোগীরা এইডস আক্রান্ত ভর্তি রোগীর আশপাশে অবস্থানে এই ভাইরাস সংক্রামণের  কোনো ঝুঁকি নেই।

এইচআইভি প্রতিরোধে আমাদের কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। একবার আক্রান্ত হয়ে গেলে এর থেকে নিস্তার পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ। তাই এইচআইভি সংক্রমণের উপায়গুলো জেনে এর প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এইডস প্রতিরোধে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তা হলো-প্রয়োজনে অন্যের রক্ত গ্রহণের আগে রক্তদাতার রক্তে এইচআইভি আছে কিনা পরীক্ষা করে নেওয়া। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও অবশ্যই এইচআইভি পরীক্ষা করে নিতে হবে। ইনজেকশন নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবারই নতুন সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার করা এবং অন্যের ব্যবহূত সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার না করা। অনিরাপদ যৌন আচরণ থেকে বিরত থাকা, যৌন মিলনের সময় অবশ্যই কনডম ব্যবহার করা। এইচআইভি বা এইডস আক্রান্ত মায়ের সন্তান গ্রহণ বা সন্তানকে বুকের দুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া। ধর্মীয় অনুশাসন যথাযথভাবে মেনে চলা। জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রতিরোধমূলক তথ্য নিয়মিত প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন ও এইডস প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই ভাইরাস প্রতিরোধে রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমাদের তরুণ শিক্ষিতসমাজকে সামাজিক সচেতনতার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
aroufiubd@gmail.com

 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।